1. abdullahharun2014@gmail.com : dailysarabela24 :
বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:২৮ পূর্বাহ্ন
নোটিশ :
দৈনিক সারাবেলা ২৪ , সত্য সংবাদ প্রকাশে আপোষহীন visit . www.dailysarabela24.com অনলাইন ভিত্তিক নিউজ পোর্টাল সংবাদ পড়ুন ও মন্তব্য করুন, আপনার প্রতিষ্ঠানের এড দিন , সংবাদ প্রকাশের জন্য যোগাযোগ করুন - ০১৯৭১-৮৪১৬৪২,০১৩২২-১৭৫০৫২
সংবাদ শিরোনাম:
জাতীয় নির্বাচনে জননিরাপত্তা ও জনকল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ফ্যাসিবাদের করুণ পরিণতির কথা মাথায় রেখে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে মাঠ পর্যায় পরিদর্শনে নৌবাহিনী প্রধান বগুড়া জেলার শাহজাহানপুরে সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে বিদেশী রিভলভার উদ্ধার র‌্যাবের নতুন নাম স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স (এসআইএফ)- স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সিএমপি’র তালিকাভুক্ত (ক্রমিক নং-৪১ ও ৪২) দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেফতার মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে অবৈধ অস্ত্র ও বোমা উদ্ধার বাংলাদেশ–জাপানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সম্পর্কিত চুক্তি স্বাক্ষর সিএমপি কমিশনারের ‘ওপেন হাউজ ডে’-তে সেবা নিলেন সেবাপ্রত্যাশী সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনী প্রধান এর গাজীপুর জেলা পরিদর্শন ও মতবিনিময় সভা

মহাকাব্যিক বিদায়

  • আপডেটের সময় : শনিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬২ বার ভিউ

বিশেষ প্রতিবেদন :

বাংলাদেশের আকাশ কদিন থেকেই ধূসর। সূর্যের দেখা নেই চার পাঁচ দিন। এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউ তে তখন গভীর রাতের নিস্তব্ধতা, ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কোনার বেডটা আলো আধারীর মায়ার খেলায় এক অপার্থিব পবিত্রতায় জড়ানো। শৈশব থেকে পৌঢ়তার সব স্মৃতিগুলো যেন আজ প্রকাশিত হবার আকাঙ্ক্ষায় অস্থির। মনিটরের সবুজ রেখাগুলো আজ সকাল থেকেই বার বার এলোমেলো। মনিটরের এ্যলার্ম বার বার জানান দিচ্ছে সময় আর বেশি নেই। শীতের তীব্রতায় অসার করা ভোঁতা অনুভূতিগুলো বুঝতেও পারছে না কি মর্মান্তিক সত্যি গুটিসুটি মেরে এগিয়ে আসছে এক ভয়ানক খবর হয়ে।

দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ীর তৈয়বা ভিলার সামনের ছোট্ট সবুজ লনে এক্কাদোক্কা খেলা কিশোরী পুতুল জীবনের বর্নিল আটটা দশক পেরিয়ে আজ অসার শুয়ে আইসিইউ র কোনার বিছানায়।

দিনাজপুরে কর্মরত কেতাদুরস্ত ক্যাপ্টেন জিয়ার চোখে এমন গভীর ভাবে আটকে যাবেন কে জানতো। স্কুলের গন্ডি পেরোতে না পেরোতেই বন্দী লাল বেনারসিতে।১৯৬৫ তে যুদ্ধ শুরু ভারত পাকিস্তানের। কিসের যুদ্ধ আর কেনই বা যুদ্ধ সেটা তেমন না বুঝলেও পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা কোয়ার্টারে যুদ্ধের পুরোটা সময় একাকী কাটিয়েছেন যুদ্ধে যাওয়া স্বামীর মঙ্গল কামনায়। ভীষণ রাশভারি, স্বল্প ভাষী স্বামী, ভালোবাসার উচ্চারণে প্রগলভ নয় কিন্তু ভীষণ অন্তর ছোঁয়া। সংসারে নেই কোন বাহুল্য আর প্রাচুর্যের ছোঁয়া শুধু আছে সততা আর ভালোবাসার গর্ব।

দিনাজপুরের ছোট্ট বাড়ীটা বার বার হাতছানি দেয় হাজার মাইল দূর থেকে। আকাঙ্খার বদলির খবরে আকাশ ছোঁয়া আনন্দ নিয়ে হঠাৎই জন্মভূমিতে ফেরত। ততদিনে কোলজোড়া তারেক- আদরের ছোট্ট পিনো আর পরপরই আরেক ছোট্ট সোনা আরাফাত ৷

সবাই তখন চট্টগ্রামে, একাত্তরের শুরু দেশ জুড়ে আন্দোলন দিয়ে। স্বামী তখন তরুণ মেজর, সারা দেশের মত বাড়ীর আবহাওয়াও বেজায় থমথমে।

পঁচিশে মার্চের বিকেল তখন, হন্তদন্ত হয়ে বাসায় স্বামীর খোঁজে তার ইউনিটের এক সৈনিক। বাসায় নেই শুনে ফিরে যাবার মুহূর্তে হঠাৎই কৌতুহলী প্রশ্ন, কি হয়েছে? “ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি অফিসার এসেছে আমাদের সব অস্ত্র নিয়ে যেতে, সেটাই জানাতে”। এসব বিষয়ে কোন দিনই নাক না গলানো খালেদা হঠাৎই নিজের অজান্তেই বলে ফেললেন, “স্যারকে না বলে ওগুলো দেবেন না।” সেদিন পাকিস্তানিরা অস্ত্রগুলো নিতে পারেনি।

সে রাতে স্বামী ঘরে ফেরেননি। খবর পেলেন, সারাদেশে পাকিস্তানিরা আচমকা ঝাপিয়ে পড়েছে নিরীহ দেশবাসীর উপর, শুরু হয়েছে নির্বিচার হত্যাকান্ড। শুনলেন রেজিমেন্টে বিদ্রোহ হয়েছে, নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরই স্বামী।

পরদিন রেডিওতে শুনলেন তাঁর স্বামী বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। এত কাছে থেকেও জানতে পারেন নি যে মানুষটা এমন কিছু একটা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একদিকে গর্ব হচ্ছে অকল্পনীয়, আবার সাথে সাথেই ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠছেন। এখন আর ফেরার পথ নেই, পরাজয় মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। হালকা অভিমান মনের কোনায় এলেও সামাল দিলেন। একবার বলে গেলে কি হোত ? তারেক – আরাফাত তখন গভীর ঘুমে। মাসের শেষ, হাতে তেমন টাকাও নেই। খবর পাচ্ছিলেন, স্বামীর বাহিনী কালুরঘাটে লড়ছেন শত্রুর বিরুদ্ধে। মেজর জিয়া তখন সারাদেশে সবচেয়ে পরিচিত নাম, আর সাথে সাথে দেশের সবচাইতে বিপদগ্রস্ত মানুষ হোল এই তিন জন। যাদের দুজনের বিপদ কাকে বলে বুঝবার ক্ষমতাই নাই আর আরেক তরুণী সেই দুই ছোট্ট শিশুদের নিয়ে পরিজন থেকে শত মাইল দূরে। আর এটাও বুঝতে পারলেন একমাত্র দেশ স্বাধীন হলেই স্বামীর দেখা পাবেন নইলে আর কোনদিনই নয়।

শুরু হোল গন্তব্যহীন অজানা যাত্রার আজ এখানে তো কাল আরেক জায়গায়। এভাবে আর কতদিন, জুলাইয়ে একদিন ধরা পড়লেন পাকিস্তানিদের হাতে, সবাই একসাথে। ঢাকা সেনানিবাসে বন্দী রইলেন দুই শিশু পুত্রকে নিয়ে ডিসেম্বরের বিজয় অব্দি ।

১৬ ডিসেম্বরে এলো সেই বহু আকাঙ্ক্ষার বিজয়, ঘরে ফিরলেন জেড ফোর্স অধিনায়ক জিয়া। কষ্টের নয় মাস তাদের কেমন কেটেছে সেটাও বলার সময় যেমন হোল না তেমনি শোনাও হলো না যুদ্ধের বীরত্ব গাঁথা। তেলিয়াপাড়ায় সেক্টর কমান্ডারদের মিটিং, কামালপুরের যুদ্ধ, মুক্তাঞ্চল রৌমারী, সিলেটের সালুটিকর আর শমসেরের নগরের যুদ্ধ, বিজয়ের দুই দিন আগে সিলেট মুক্ত করার গল্প, যমুনার চর – চা বাগানের খোলা আকাশের নীচে রাতের পর রাত কাটানোর গল্পগুলোও শোনা হলো না আসল বীরের নিজ কন্ঠে।

যোগ্যতা আর প্রাপ্যতা থাকা সত্বেও সেনা প্রধান না হওয়ার কোন আক্ষেপ শুনলেন না স্বামীর কাছে। কুমিল্লা হয়ে ঢাকায় এলেন সেনা বাহিনীর উপ প্রধানের স্ত্রী হয়ে। সময় গড়ালো নিজের মত, দেশে তখন নিদারুণ দুর্ভিক্ষ, প্রতিদিনই অনাহারে মৃত্যুর খবর আসে। চারিদিকে একটা পরিবর্তনের গুমোট বাতাবরণ। ১৯৭৫ এর আগস্ট – নভেম্বর দেশকে এক নতুন ক্রান্তিকালে দাঁড় করিয়ে দিল। স্বামীর কাছে শেষ আগস্টে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব এলেও নভেম্বরই কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো পরিবার গৃহবন্দী হলো খালেদ মোশাররফ বাহিনীর হাতে। পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এক অনিশ্চিত দিন গননা। হঠাৎই দেখলেন সৈনিকদের গগনবিদারী উল্লাসে আর বিজয় আনন্দে স্বামীকে একরকম কাঁধে করে সৈনিক জনতার নেতৃত্বের আসনে। একাত্তরের মত আরেক ক্রান্তিলগ্নে জাতির দিশারি জিয়াউর রহমান। এরপর সেনা প্রধানের স্ত্রী প্রেসিডেন্টের স্ত্রী, তাতে কি? সবসময়ই রইলেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। স্বামীর সময় কাটে দেশের কাজে, অসম্ভব জনপ্রিয় স্বামীর গল্পগাথা মানুষের মুখে মুখে ফেরে কিন্তু নিজে সেটার অংশ হতে পারেন না। আটপৌর গৃহবধূর জীবন কাটে সন্তানদের নিয়ে। প্রেসিডেন্টের খাবার টেবিল আলোকিত হয় রেশনের মোটা চালের বিকর্ষক গন্ধ, সব্জি -ডাল, ছোট মাছ আর কদাপি মুরগীর ঝোলে। ছেলেদের সন্তুষ্ট থাকতে হয় বাবার পুরনো শার্ট প্যান্ট নিজেদের মাপে মানানসই করে বানিয়ে।

মাঝে মাঝে রাস্ট্রীয় প্রটোকলে বাধ্য হয়ে জনসমক্ষে যেতে হয়, বরাবরের মত সলজ্জ নিরাভরণ কিন্তু সেই স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের অপরুপ ঔজ্জ্বল্যের দ্যুতি ছাপিয়ে যায় সবকিছু।

একাশির ২৯ মে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন, রাতে জিয়া ফোনে জানিয়েছেন ফিরছেন সকালেই। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের সকাল আর কোন দিনই এলো না। প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টির সেই রাতে তাদের গভীর ঘুমের মাঝে সবার অজান্তেই ঘটে গেল হৃদয় বিদারক দূর্ঘটনা, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নিহত হলেন জিয়া। শুরু হোল অনিশ্চিত দীর্ঘ যাত্রা পথ। আঘাতে আঘাতে ততদিনে একাকী পৃথিবীর পথ চলা তিনি রপ্ত করে ফেলেছেন।

স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তখন বিপর্যস্ত। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে সরিয়ে এরশাদ ক্ষমতায়, দলের শীর্ষ নেতারা একে একে দল ছাড়ছেন। এমনি অনিশ্চিত দিনে নেতাকর্মীদের ক্রমাগত চাপ এড়াতে পারলেন না। হাল ধরলেন দলের। অনভিজ্ঞ এক আটপৌরে গৃহবধূর জন্য রাজনীতির অগ্নিপরীক্ষা। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে মাঠে রইলেন কর্মীদের সারিতে দাড়িয়ে। পুলিশের লাঠির আঘাত, গ্রেফতার কিছুই টলাতে পারলো না। বিভিন্ন প্রলোভনে আন্দোলনের সহযাত্রী দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যখন পথভ্রষ্ট তখন সবার অজান্তেই আপোষহীন শব্দটা তাঁর নামের সমার্থক হয়ে উঠলো। আর সেটা যখন তাঁর একক পরিচিতি হয়ে উঠলো তখন সেটাতে বিশ্বস্ত থাকতে সর্বতোভাবে রইলেন আপোষহীন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

নব্বইয়ের গনঅভ্যুত্থানে তখন বিজয়ী জনতা আর বলতে গেলে অপ্রত্যাশিত বিজয় তাঁর দলের। জীবনে প্রথম বারের মত নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাচটি আসনেই জয়ী, সেটাও আবার দেশের বিভিন্ন আসন থেকে। সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ১৮ টি আসনের সবকটিতেই নিরঙ্কুশ শতভাগ জয়। এ এমন এক কীর্তি যা স্পর্শ করে সাধ্য কার। মুখে দেয়া কথার প্রতিশ্রুতি রাখলেন কোন তালবাহানা ছাড়া। যে রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা তাঁকে দিতে পারতো বার বার রাস্ট্রপতি নির্বাচিত হবার নিশ্চিত সূযোগ, রাজনীতিতে নীতির দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত করে নির্দ্বিধায় মেনে নিলেন আপাত চ্যালেন্জিং সংসদীয় ব্যবস্থা। পরের সূযোগে আরো জনমুখী সিদ্ধান্তে অবাধ আর সুষ্ঠু ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে প্রবর্তন করলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, অধিক স্বচ্ছতায় নির্বাচিত হয়েও পদত্যাগ করলেন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে।

পরের মেয়াদে নারীশিক্ষা সহজতর করতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত মেয়েদের জন্য সেটা করলেন সম্পূর্ণ অবৈতনিক।

এর পর এলো ভয়াবহ এক এগারো। তছনছ হোল তাঁর দল। বন্দী হলেন অন্যায়ভাবে,দুই সন্তানের উপর চালানো সীমাহীন নির্যাতনের সাক্ষী হলেন পরম ধৈর্য্যে। এর মাঝে মাকে হারালেন, নির্যাতনে প্রায় পঙ্গুত্বের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেককে দেখলেন নির্বাসিত হতে। মঞ্চস্থ হতে শুরু করলো প্রহসনের পরিকল্পিত নাটক একে একে। ভোটারবিহীন নির্বাচন, নিশি রাতের নির্বাচন আর সবশেষের আমি ডামির নির্বাচন চব্বিশে ।

২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর, মুখোমুখি হলেন এক অমানবিক হিংসার, পরশ্রীকাতরতায় দগ্ধ এক স্বৈরিণী তার বিষাক্ত নিশ্বাসে তাঁকে চরম অসম্মানজনকভাবে জগতের সকল অনাচারকে লজ্জায় ফেলে সৃষ্টি করলো জিঘাংসার নতুন উদাহরণ। স্বামী সন্তান আর দীর্ঘ সংসারের স্মৃতি বিজড়িত বাড়ী থেকে উচ্ছেদ হলেন অমানবিকভাবে। দরজা ভেঙে শুধু বলপূর্বক উচ্ছেদেই থেমে থাকলো না, কদর্য মানসিকতায় তাঁর চরিত্র হননে তার বাথরুমে মদের বোতল সাজিয়ে পৈশাচিকতার ষোলকলা পূর্ণ করলো তারা।

৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, হাসিনার রোষানলে পড়লেন মরনঘাতি আক্রোশে। সম্পূর্ণ সাজানো মিথ্যা মামলায় কারারুদ্ধ হলেন নাজিমুদ্দিন রোডের নির্জন কারাবাসে। পরিত্যক্ত, অস্বাস্থ্যকর আর জনমানবহীন সেই নির্জন কারাবাসের একমাত্র সঙ্গী পরিচারিকা ফাতেমা। তার সাথে ভাগাভাগি করেছেন আহার্য, সময় আর প্রক্ষালন কক্ষ। তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক রাস্ট্রপতি আর সেকটর কমান্ডারের স্ত্রীর কি নির্মম জীবনযাপন। কারাবাসে গেলেন সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মানুষ আর ফিরলেন লিভারের দূরারোগ্য অসুখ নিয়ে।

বছরের পর বছর রইলেন চিকিৎসা বঞ্চিত। বার বার শিকার হলেন অশ্লীল আর কদর্য বাক্যবাণে, একবার দুবার নয়, বার বার। দেশের বরেণ্য চিকিৎসকরা সেবা দিলেন সাধ্যমত, নিজেদের জ্ঞান আর শ্রদ্ধা উজাড় করে। স্বৈরাচারী হাসিনা আর তার ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগ নির্যাতন, মামলা, হামলা, গুম, খুন আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের মহোৎসব চালিয়ে নিজেদের যখন অজেয় ভাবতে শুরু করেছিল।ঠিক তখনই বিস্ফোরণ হলো আগ্নেয়গিরির, সতের বছর ধরে পুঞ্জিভূত লাভা প্রচন্ড অগ্নুৎ্পাতে উদ্গীরন করলো তার সকল বন্চনা, ক্ষোভ আর ক্রোধকে একীভূত করে। এই সূদীর্ঘ সময় তাঁর অবর্তমানে সূদুর প্রবাস থেকে বিচক্ষণতার সাথে দলের হাল ধরে আন্দোলনকে সাফল্য দিতে প্রধান সেনাপতির ভূমিকা রাখলেন পুত্র তারেক রহমান। স্বৈরাচারী হাসিনা জনরোষ আর প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে গেল তার আশ্রয় দাতার দেশে। সকল অহংকার বিচূর্ণ হোল এক পলকে।

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তখন আর শুধু দেশনেত্রী নন কৃতজ্ঞ জাতির সামনে তিনি তখন তাঁদের অভিভাবক – দেশমাতা।

বিজয়ী বাংলাদেশে তিনি মুক্ত হলেন সকল অন্যায় মামলা থেকে। প্রথমবারের মত বিদেশে গেলেন উন্নত চিকিৎসার প্রত্যাশায়, ততক্ষণে দেরি হয়েছে অনেক। কাতারের আমীরের সৌজন্যে এয়ার এম্বুলেন্স তাঁকে হিথরো বিমানবন্দরে পৌছানোর সাথে সাথে পেলেন বহু আকাঙ্ক্ষার পুত্র সান্নিধ্য, সাথে যুক্ত হোল পুত্র বধুর সেবা আর নাতনিদের মধুর শাসন। ফিরলেন দেশে, লিভার প্রতিস্থাপন ততদিনে আর নিরাপদ নয় তাঁর জন্য। ফিরলেন দেশে কিন্তু স্বৈরাচারের দেয়া নিষ্ঠুর অসুস্থতা তাকে বার বার টেনে নিল হাসপাতালের শয্যায়। চিকিৎসকদের নিষেধ অমান্য করে এবছরের ২১ নভেম্বর গেলেন সশস্ত্র বাহিনী দিবসে, তাঁর সেই চির চেনা অঙ্গনের হাতছানি উপেক্ষা না করতে পেরে। গুণগ্রাহীদের শ্রদ্ধায় বার বার হারিয়ে যাচ্ছিলেন ভীড়ে, নিষেধের মাস্ক নাক মুখ থেকে সরে গেছে ততক্ষণে। বিদায় বেলায় বাহিনী প্রধানদের স্মরণ করিয়ে দিলেন ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তাঁদের করণীয়।

বাড়ী ফিরে আক্রান্ত হলেন ফুসফুসের সংক্রমণে। ২৩ তারিখে শ্বাস প্রশ্বাসের কষ্ট আবারও টেনে নিল হাসপাতালে। এবারের যুদ্ধ একটু অন্যরকম, একের পর এক জটিলতাগুলো তাঁর বাড়ী ফেরা বিলম্বিত করছিল। চিকিৎসকরা যখন প্রায় হাল ছেড়েছেন ঠিক তখনই সারা দেশের আপামর জনগণ তাদের পরমাত্মীয়ের জন্য শুরু করলেন ক্লান্তিহীন দোয়া, সদয় হলেন মহান আল্লাহ, সংকট কাটতে লাগলো একে একে। এদিকে পুত্রের দেশে ফেরার সময় ঘনিয়ে এলো – ২৫ ডিসেম্বর। অবস্থার উন্নতি অবনতি তখন সময়ের সূতোয় বাধা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সব ব্যখ্যা আর অভিজ্ঞতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তার হৃদপিন্ড দিব্যি জানিয়ে দিল ওটাও আপোষহীন।

পুত্র সান্নিধ্যের প্রতীক্ষার শেষ হোল ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়। পুত্রের হাতের স্পর্শে মাতৃভক্তির অনুভূতি সঞ্চারিত হোল সন্তুষ্ট মায়ের হাসিতে।

আপোষহীন বলে বলে দেশের মানুষ সামান্যতম বিচ্যুতির ব্যাপারটাও অসম্ভব করে তুলেছিল তাঁর জন্য। জীবনের কোন পর্বেই আপোষকামীতার লজ্জা তাঁকে আনত করেনি এতটুকুও।

কনকনে শীতের দীর্ঘ রাতও শেষ হয়ে আসছে, আলো ফুটলেই আরেক নতুন দিন – ডিসেম্বর ৩০। এভারকেয়ারের আইসিইউতে তখন হিম শীতল নীরবতা। মনিটরের সবুজ রেখাগুলো ক্লান্তিতে তখন এলোমেলো। যাবার সময় ঘনিয়ে আসছে, শক্ত করে ধরে রাখা পুত্রের হাতের স্পর্শ কেন জানি আস্তে আস্তে অনুভূতির দেয়াল পেরিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে দূরে – অনেক দূরে। দূর থেকে ভেসে আসছে ফজরের আযান – আর কুয়াশা ঘেরা ভোরে জিয়া উদ্যানে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকা প্রিয়তমের পাশে নিশ্চিন্ত অনন্ত নিদ্রার আহ্বান, সেটাই বা উপেক্ষা করবেন কি করে। পরিজনদের প্রিয় মুখগুলো একটু পরেই বিষন্নতর হবে তিনি জানেন। সাথে এটাও জানেন এখন তাঁর প্রিয়জনের সংখ্যা নিযুত পেরিয়ে কোটির গুনিতক ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। দূর আকাশ থেকে তিনি দেখবেন, কনকনে শীতের তীব্রতা কমাতে আজ অকৃপণ সূর্য তার সবটুকু উষ্ণতা নিয়ে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়, তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে জনতার স্রোত আজ ঢাকার কোন রাজপথ এমনকি অলিগলিকেও অভিমানী রাখেনি এতটুকুও, প্রত্যেককে ভরিয়ে দিয়েছে কানায় কানায়, গুণমুগ্ধের অগনিত সংখ্যায়। শুধু ইতিহাস দিয়ে এর পরিমাপ অসম্ভব, নিছক কল্পনার নয়, রাজনীতি, সভ্যতা আর ত্যাগের এ এক জীবন্ত মহাকাব্য।

তাঁর শেষ শয্যা এ মাটিতেই, কথা রেখেছেন দেশমাতা, এদেশের বাইরে তাঁর কোন ঠিকানা নেই। মা আমাদের, তোমার ঋণ শোধ আমাদের সাধ্যাতীত, শুধু উজাড় করা শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা – এটুকুই যা দেবার, আমাদের ভান্ডার শূন্য করে নাও তার সবটুকু। আজ আর কিছুই চাই না আমাদের।

মতামতঃ
অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল
আহবায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল।

এই পোস্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে ভাগ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ©2024 ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি
Desing & Developed BY ThemeNeed.com