বিশেষ প্রতিবেদন :
সকল জল্পনা-কল্পনা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি সামরিক আক্রমণ শুরু করেছে ইসরায়েল। শনিবার ভোরে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) তেহরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে “প্রতিরোধমূলক হামলা” (Preemptive strike) চালিয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা গোটা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
সামরিক প্রেক্ষাপট ও তেহরানের পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থল এবং উত্তরের সাইয়্যেদ খানদান (Seyed Khandan) এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আকাশে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। প্রাথমিক তথ্য বলছে, কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় আঘাত হেনেছে। তবে নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে যে, ৮৬ বছর বয়সী খামেনিকে আগেই একটি সুরক্ষিত ও নিরাপদ স্থানে (Secure location) সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই হামলার পরপরই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দেশজুড়ে ‘বিশেষ জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেন। ইসরায়েলের হোম ফ্রন্ট কমান্ড (Home Front Command) নাগরিকদের জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে এবং সম্ভাব্য ইরানি মিসাইল ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় তেল আবিবসহ পুরো ইসরায়েল জুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। বর্তমানে উভয় দেশই তাদের আকাশসীমা বেসামরিক ফ্লাইটের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা
ইসরায়েলের এই সামরিক পদক্ষেপ আকস্মিক হলেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। সম্প্রতি জেনেভায় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার সতর্ক করেছিল যে, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে সরে না আসে, তবে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না।
এর আগে গত বছর (২০২৫ সালের জুন মাসে) ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের একটি তীব্র বিমান যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। সেই সংঘাতের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর একটি নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানা যায়, এই হামলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ও লজিস্টিক সহায়তা রয়েছে। হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইসরায়েলে অবস্থানরত তাদের অ-জরুরি দূতাবাস কর্মী এবং মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত ইসরায়েল ত্যাগের নির্দেশ দেয়, যা আসন্ন সামরিক অভিযানের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। এছাড়া, এই অঞ্চলে আগে থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ (Carrier strike groups) অবস্থান করছে।
ভবিষ্যৎ পরিণতি অনুধাবন করে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই “আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা” মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয় ইরান এর কী সামরিক জবাব দেয়। যদি তেহরান বড় পরিসরে পালটা আক্রমণ চালায়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি করবে।
Leave a Reply