বিশেষ প্রতিবেদন :
মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে উত্তেজনা বা সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই সংঘাতের প্রত্যক্ষ অংশীদার না হলেও বাংলাদেশ এর বহুমাত্রিক প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। জ্বালানি খাতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব তেলের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায়, সংঘাত তীব্র হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। এতে বাংলাদেশের জন্য আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পখাতের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনদুর্ভোগ দূর করার লক্ষ্যে মূল্যবৃদ্ধিকে সরকার ভর্তুকি বা বিশেষ প্রণোদনা হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় দাম বাড়লেও, বাংলাদেশের বাজারের চিত্র বেশ ভিন্ন। জনগনের জন্য রাষ্ট্রপ্রধানের এ-এক যুগপযুগী, কৌশলী এবং অভিনব সিদ্ধান্ত।
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর শাসনামলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করে। বিশেষ করে, তাঁর ১৯৭৭ সালের সৌদি আরব সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই সফরের মাধ্যমে তিনি সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচন করেন। বিশেষ করে শ্রমবাজার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও ধর্মীয় সংযোগ—সব ক্ষেত্রেই এই সফরের ইতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী ছিল। এই সফরের একটি প্রতীকী ও ঐতিহাসিক দিক হলো তিনি বাদশাহ খালিদ বিন আবদুল আজিজকে নিম গাছের চারা উপহার দেন, যা তথাকথিত “জিয়া ট্রি” হিসেবে আজও পরিচিত।
তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে কাজে লাগিয়ে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা কিংবা Organization of Islamic Cooperation (OIC)-এর সঙ্গে সক্রিয় সম্পৃক্ততা জোরদার করেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। একই সঙ্গে, রাষ্ট্রপতি জিয়া ফিলিস্তিন ইস্যুসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে মুসলিম উম্মাহর পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন, যা বাংলাদেশকে একটি দায়িত্বশীল ও নীতিনিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
জিয়াউর রহমানের এই ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে সুদৃঢ় হয়। তাঁর বলিষ্ট নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমবাজার সর্বপ্রথম উন্মুক্ত হয়। ফলশ্রুতিতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে একটি স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করে। যা পরবর্তীকালে তাঁর সহধর্মিণী এবং বাংলাদেশের তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরেই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে রূপান্তরিত হয়। ক্রমান্বয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে তোলে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। নারী জাগরণ এবং কর্মসংস্থানের হাতে খড়ি সমাজ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যখন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনীতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া এবং বেগম খালেদা জিয়ার এই দূরদর্শী উদ্যোগগুলো আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বলা বাহুল্য, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে আজও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হলো জিয়ার ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবধর্মী পররাষ্ট্রনীতি। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তাঁর সেই নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রাসঙ্গিকতা আরও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে তাঁদেরই সুযোগ্য উত্তরসূরি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের “সবার আগে বাংলাদেশ” – নীতিতে ।
দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা থেকে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার সূচনালগ্নে এমন বৈশ্বিক সংকটকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং এখনই সময়—ঘরে-বাইরে দৃঢ় ও কার্যকর ভূমিকা রাখার; অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা প্রদর্শনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যোগ্য নেতৃত্বের পরিচয় দেওয়ার। ঠিক যেমনটি করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আশির দশকের শুরুতে সংঘটিত ইরান-ইরাক যুদ্ধ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক গভীর সংকটময় অধ্যায়। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে মুসলিম বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র—ইরান ও ইরাক—পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলে তা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি ভারসাম্যপূর্ণ, দায়িত্বশীল এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানমুখী কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি দ্বন্দ্বে কোনো পক্ষ না নিয়ে বরং উভয় দেশের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার আহ্বান জানান। তাঁর এই অবস্থান ছিল নীতিনিষ্ঠ ও দূরদর্শিতার প্রতিফলন, যা বাংলাদেশকে একটি নিরপেক্ষ, শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর এই বলিষ্ঠ ভূমিকা আজও অবিস্মরণীয়।
বর্তমান বৈশ্বিক ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে সামনে রেখে, তাঁর শান্তি উদ্যোগের প্রাসঙ্গিকতা আবারও অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে Organisation of Islamic Cooperation (OIC)-এর প্ল্যাটফর্মে তিনি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য, সংহতি ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কেবল বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপকে উৎসাহিত করে এবং সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই তিনি ওআইসিকে একটি কার্যকর মধ্যস্থতাকারী সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ছিল—সংঘাত নিরসন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত শক্তিকে সুসংহত করা।
এদিকে দীর্ঘদিন পর যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হলো মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। সামরিক কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার ৫৫তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করেছে। ১৯৭১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটলেও এর বীজ রোপিত হয়েছিল বহু আগে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের মানুষ লাভ করে ভারত ও পাকিস্তান—এই দুই রাষ্ট্র। কিন্তু এরপরই শুরু হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বাঙালিদের ওপর নতুন করে শোষণ ও পরাধীনতার শৃঙ্খল আরোপের প্রক্রিয়া।
পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় পূর্ব পাকিস্তান, তথা আজকের বাংলাদেশ।
১৯৪৮ সালে ভাষার দাবিতে সূচিত আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়, ১৯৫৬ সালের সংবিধান প্রণয়ন আন্দোলন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং ১৯৬৯ সালের রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থান—সব মিলিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে।
একাত্তরের ২৬ মার্চ, আসে স্বাধীনতার ডাক! এর আগের দিন, ২৫ মার্চ মধ্যরাতে, বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সারাদেশে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালনার মাধ্যমে বাঙালি জাতির কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার নির্মম প্রচেষ্টা চালায়। অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে তারা ভেবেছিল পূর্ব পাকিস্তানকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র।
বলা হয়, প্রকৃতি তার শূন্যস্থান পূরণ করে নেয়, সেটি সময় কিংবা মানুষ দিয়ে। এই প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চের কালরাতে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসেন সেনাবাহিনীর এক মেজর। নাম, মেজর জিয়াউর রহমান!
২৬ মার্চ-এর আগেই চট্টগ্রামে অস্ত্রবোঝাই জাহাজ ‘সোয়াত’-এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়, যেন জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করে পশ্চিমা সৈন্যদের হাতে পৌঁছতে না পারে। এই ব্যারিকেড সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কারের কাজে লাগানো হয় বাঙালি সৈন্যদের, যা চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। রাত ১১টায় চট্টগ্রামস্থ অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট-এর কমান্ডিং অফিসার (অধিনায়ক) লে. কর্নেল আবদুর রশীদ জানজুয়া আকস্মিকভাবে রেজিমেন্ট সেকেন্ড-ইন-কমান্ড (উপ-অধিনায়ক) মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে বন্দরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের মঙ্গল এবং স্বাধীনতার কথা চিন্তা করে মেজর জিয়া তাঁর সহযোদ্ধাদের তথা অফিসার, জেসিও এবং জোয়ানদের একত্র করে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন; উপস্থাপন করেন যুদ্ধের পরিকল্পনা। ২৬ মার্চ রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটে এই সাহসী বীর মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন—“We revolt।”
২৭ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে যান মেজর জিয়া। বেতার কর্মীরা তাঁকে পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন, স্বাধীন বাংলাদেশ যেন এই সূর্যসন্তানের হাতেই। এদিকে, বেতার কর্মীরা বারবার ঘোষণা করছিলেন যে, আর মিনিট-পনেরোর মধ্যে মেজর জিয়াউর রহমান ভাষণ দেবেন। কিন্তু কী বলবেন তিনি? একটি করে বিবৃতি লেখেন, আবার তা ছিঁড়ে ফেলেন। প্রায় দেড় ঘণ্টায় তৈরি করেন ঐতিহাসিক ঘোষণাটি। সেটি তিনি বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় পাঠ করেন, যা দ্রুতই দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘোষণা সাধারণ মানুষকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে, এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে দৃশ্যমান করে তোলে। এই ঘোষণাটি কয়েক দিন ধরে কিছুক্ষণ পর পর প্রচারিত হতে থাকে।
মূলত, মেজর জিয়াউর রহমানের এই সিদ্ধান্ত ছিল সময়োপযোগী, সাহসী ও কৌশলগত। তিনি যদি সেদিন দ্রুত বিদ্রোহের ডাক না দিতেন, তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। অথচ রাজনৈতিক কারণে এখন অনেকেই তার সেই সাহসী সিদ্ধান্ত আর স্বাধীনতার ঘোষণাকে স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত বোধ করেন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় ১৬ ডিসেম্বর। বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের। লাল-সবুজের পতাকায় শোভিত হয় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের নতুন একটি ভূখণ্ড। এরপর জিয়াউর রহমান পুনরায় সামরিক জীবনে ফিরে যান।
উল্লেখযোগ্য যে, স্বাধীনতা অর্জিত না হলে তাঁকে চরম মূল্য দিতে হতো। তাঁর দেওয়া যে ডাকে সাত কোটি জনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেটিই হতো তাঁর ফাঁসির জন্য একমাত্র কারণ।
তবু দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা, মমতা ও দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি সেই ঝুঁকি নিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, ২৫ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর মেজর জিয়ার দুঃসাহসিক সেই আত্মপ্রকাশ মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের গতি নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সেদিন তিনি যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন তার স্বীকৃতি রয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র গোপন দলিলেও। তিনি যেভাবে যে ভাষায় বক্তব্যটি দিয়েছিলেন সিআইএ সেভাবেই সেটি সংরক্ষণ করে। পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ভারতের রাষ্ট্রপতি মোরারজী দেশাই-সহ আরো অনেকেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া, তাঁর এই কীর্তির কথা লন্ডনের গার্ডিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও সংবাদ মাধ্যম লিপিবদ্ধ করে। নথিবদ্ধ রয়েছে ১৯৮২ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম প্রকাশিত স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র-এর ১৫তম খণ্ডে।
এমনকী ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কের কলম্বিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির এক সেমিনারে বক্তৃতায় বলেন, ‘শেখ মুজিব এখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। তিনি চাচ্ছেন সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান, যার সুযোগ এখনো আছে’। ‘ইন্ডিয়া সিকস’-নামক বইতে ইন্দিরা গান্ধীর এ বক্তব্যটি সংকলিত হয়েছে। ১৯৭৮ সালে ভারত সফরকালে দিল্লিতে জিয়াউর রহমানের সম্মানে আয়োজিত ভোজ সভায় ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি প্রেসিডেন্ট জিয়াকে বলেন, ‘সর্বপ্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা আপনার’।
যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে বসেন শেখ মুজিবুর রহমান। গোটা মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাসই দেশের বাইরে থেকে তিনি যুদ্ধে মানুষের ত্যাগ ও বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারেননি। তাইতো ক্ষমতার স্বাদ পেয়েই অনেকটা বেসামাল হয়ে পড়েন। খুব দ্রুতই চারপাশে সুবিধাবাদী, আর অসৎ লোকে ছেয়ে যায়। ফল হিসেবে, রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়।
শুধু তাই নয়, যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির একটি ছোট্ট দেশকে তাঁর সান্নিধ্যে থাকা দুর্নীতিবাজরা অক্টোপাসের মতো জাপটে ধরে। শুরু হয় লুটপাটের মহোৎসব! অর্থ ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে! চারিদিকে শুরু হয় শোষণ, যাতনা আর নির্যাতনের নতুন অধ্যায়, যেন পুনরায় পূর্বের সময় ফিরে এসেছে। এক পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমান ‘বাকশাল’ কায়েম করেন।
মানুষের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পাশাপাশি কেড়ে নেওয়া হয় মানুষের রাজনৈতিক অধিকারও। যে শোষণ-নির্যাতন আর নিপীড়ণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ মাসের সংগ্রাম, সেটি যেন মুহূর্তেই ধুলিস্যাৎ হয়ে যায় মুজিবের স্বেচ্ছাচারিতায়। লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশ রাতারাতি পরিচিতি পায় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র দেশে।
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এখানেও ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ঘটনার পথপরিক্রমায় তিনি এদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। এর পরের ইতিহাস? একটি বৈপ্লবিক সোনার বাংলাদেশের। গণতন্ত্র আর সুশাসন প্রতিষ্ঠার পর, তিনি দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে গতিশীল করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার সবুজ-বিপ্লব দেশের কোটি কোটি অভুক্ত মানুষের মুখে তৃপ্তির হাসি ফোটায়।
তাঁর উদ্যোগে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি, গ্রামীণ অর্থনীতি হারিয়ে যাওয়া প্রাণ ফিরে পায়। ফাঁকা মাঠ ভরে উঠে ধান এবং অন্যান্য শস্যে, ফিরে সেই গোয়াল ভরা গরুর সোনালী রোদ্দুর! আন্তর্জাতিক অঙ্গণে জিয়ার পরিচিতি গড়ে ওঠে একজন ‘ভিশনারি লিডার’ হিসেবে। একটি উন্নত অগ্রগামী বাংলাদেশের সত্যিকারের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। স্বীকৃতি অর্জন করেন একজন দূরদর্শী নেতা হিসেবে।
দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশকে ফের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ফিরিয়ে এনেছে। বাংলাদেশের সবথেকে সফল ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গড়া দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র নেতৃত্বের ভার পড়ে তাঁদেরই সুযোগ্য সন্তান ও বাংলাদেশের প্রাণ তারেক রহমানের কাঁধে।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার গঠন করে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি। লক্ষ্য একটাই— “সবার আগে বাংলাদেশ”।
বর্তমান নেতৃত্বের কাছে জনগণের প্রত্যাশা—অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখা। বৈশ্বিক শান্তির আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণই আজ সময়ের দাবি। তারই ধারাবাহিকতায়, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশকে সঠিক নেতৃত্ব প্রদানের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য সংকটেও জোরালো ভূমিকা রাখছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান।
সরকার গঠনের এক মাস না হতেই বাস্তবায়ন হয়েছে নির্বাচনের ইশতেহারে থাকা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, এড-টেক উন্নয়ন, ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল, নারী অধিকার সুনিশ্চিত, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা, স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ আরো অনেক কাজ। পরীক্ষামূলকভাবে ৩৭,৫৬৭ পরিবার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বুঝে পেয়েছেন, যা পর্যায়ক্রমে ৫০ লক্ষ এবং পরবর্তীতে প্রায় ২ কোটি পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে তারেক সরকার।
এছাড়াও, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী চেতনা ও স্বপ্নের সবুজ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। দেশের কৃষিকে আরও সমৃদ্ধশালী এবং আধুনিক করতে কৃষকদের জন্য একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র, ‘কৃষক কার্ড’-এর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যা আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গ্রামীণ কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হবে। এই কার্ড ব্যবহার করে কৃষকরা সরকারি ভর্তুকি, ঋণ এবং সার-বীজ সহায়তাসহ দশ ধরনের সুবিধা সরাসরি ভাবে উপভোগ করতে পারবে।
বর্তমান প্রজন্ম এবং দেশের আপমর জনগণ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই স্বল্প সময়ে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ, উদ্যোগ এবং সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বাংলাদেশের নবজাগরণের বিশেষ দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। বৈশ্বিক শান্তি আহ্বানের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পিতার দেশের প্রতি ভালোবাসা ও উন্নয়নের দূরদর্শিতা এবং মাতার দেশের জনগণের প্রতি অশেষ ত্যাগ ও আপোষহীন মনোভাবের অনুসৃত পথ ধরে তিনিও হয়ে উঠবেন একজন ‘ন্যাশন ড্রিমার’!”
লেখক: অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান
অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ ও আহ্বায়ক, সাদা দল—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Leave a Reply