বিশেষ প্রতিবেদন :
(নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ প্রতিনিধি)
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার আলোকিত মানুষ গড়ার বিদ্যাপীঠ ও ঐতিহ্যবাহী সরকারি মুড়াপাড়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২৫তম বর্ষপূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রিয় শিক্ষককে কাছে পেয়ে আনন্দ-উল্লাস আর ফটোসেশনে মেতে উঠেন সাবেক শিক্ষার্থীরা। শুক্রবার ( ১২জুন) রূপগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির পাশে ৩৩বিঘা জমি নিয়ে প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে অবস্থিত এ বিদ্যালয়ের ১২৫তম বর্ষপূর্তিতে উৎসবমুখর নবীন-প্রবীনের মিলনমেলা, আনন্দ-উল্লাস আর গান-গল্প-আড্ডায় মেতে উঠে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষর্থীরা।
অনুষ্ঠানে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ স্বামী-স্ত্রী, সন্তান এমনকি নাতি-পুতি নিয়েও অংশ নেন। একসময়ের সহপাঠীকে কাছে পেয়ে গল্পে-স্মৃতিচারণায় তাঁরা ফিরে যান শৈশব-কৈশোবের বিদ্যালয়ের দিনগুলোতে। অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিদ্যালয় মাঠে স্থাপিত ফটোবুথ, মঞ্চ, পেন্ডেল, বিদ্যালয় ভবন আর প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্যাম্পাসে দল বেঁধে ছবি তুলেন। কেউবা তুলেন সেলফি। ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে কাছে পেয়ে একে অপরকে আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরেন। স্মৃতিচারণ করেন।
উৎসবে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকেই দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। হাজারো নবীন-প্রবীণের প্রাণোচ্ছল অংশগ্রহণে সবুজে প্রকৃতি আরো চঞ্চল হয়ে উঠে। মুখর হয়ে উঠে স্কুল মাঠ প্রাঙ্গন। আনন্দের ঢেউ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল সাড়ে ৮টা থেকে রাত পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে বসেছিল নবীন-প্রবীনদের এক মিলনমেলা। বাঁধভাঙ্গা, আনন্দ আর উৎসবের সৃষ্টি হয়েছে সেখানে। কুশল বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান চত্বর হয়ে উঠে মুখরিত। শৈশবের কথা, স্মৃতি চারণ, আলোচনা সভা আর ফাঁকে ফাঁকে চলে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সেলফি আর ফটোসেশন।
সকাল ১০টায় গুণীজনদের উত্তরীয় পরিয়ে ও জাতীয় সংগীতের সুরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর ১২৫টি বেলুন উড়িয়ে এবং শান্তির প্রতীক কবুতর অবমুক্তকরণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হয়।
১২৫তম বর্ষপূর্তিতে এসো মিলি হৃদয়ের টানে ও ১২৫তম বর্ষে শত প্রাণ, বাজুক মনে ঐক্যতান স্লোগানকে সামনে রেখে বিদ্যালয়ের এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ উপলক্ষে তোরণ নির্মাণ, বিদ্যালয় মাঠে বিশাল পেন্ডেল, কালের যাত্রার ধ্বনি নামে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। পাঁচ হাজারের বেশি সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। কৃতি শিক্ষার্থী এবং প্রয়াত ছাত্র, শিক্ষক ও গুণীজনকে জানানো হয় সম্মাননা।
আয়োজনে ছিল অতিথি ও গুণীজনদের উত্তরীয় পরিয়ে বরণ, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ, প্রয়াত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্মরণে দোয়া ও এক মিনিট নিরবতা পালন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন, ১২৫টি বেলুন উড়ানো ও কবুতর অবমুক্তকরণ, স্মারক উন্মোচন ও বিতরণ, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা, আনন্দ শোভাযাত্রা, কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও স্মৃতিচারণ, আবৃতি, যাদু প্রদর্শনী ও একক সংগীত এবং ব্যান্ড লাইভ কনসার্ট।
১৯৮৩ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ও রূপগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ- সভাপতি শফিকুল আলম ভুইঁয়া বলেন, ১৯০১ সালে ৩৩বিঘা জমি নিয়ে সরকারি মুড়াপাড়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।দীর্ঘ একশতাব্দী ধরে জ্ঞানের যে মশাল এ প্রতিষ্ঠানটি প্রজ্জলিত রেখেছে, তার আলো আজ বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাষাতাত্ত্বিক, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক ডক্টর কাজী দীন মুহাম্মদ এ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। বাংলার প্রথম সেনাপ্রধান ও ৩নং সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ (বীর উত্তম) এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। এমনি করে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী এ বিদ্যালয় থেকে পাস করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজ্ঞ, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক হয়েছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ আলোকিত মানুষ গড়ার কাজ করে চলছেন।
উদ্বোধনের পর ১২৫তম বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির আহবায়ক ১৯৬৯সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান মঞ্চের মূল আয়োজন শুরু হয়।
শৈশব, কৈশোরের মধুময় স্মৃতিচারণ করে স্বাগত বক্তব্যে আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব গোলাম ফারুক খোকন বলেন, বিজ্ঞানসম্মত বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নকে আরো আধুনিক করতে হবে। গরিব মেধাবীদের সহযোগিতা করা হবে।
সভাপতির বক্তব্যে কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, আজ গৌরবময় ঐতিহাসিক দিন। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয় থেকে শত শত শিক্ষাথী প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কে কোন পেশার, সেটা বড় কথা নয় সবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধ শিখতে হবে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১২৫তম বর্ষপূর্তি শুধু সময়ের পরিমাপ নয়, এটা একটি দীর্ঘ সংগ্রাম, ঐতিহ্য, সাফল্য ও অগণিত মানুষের ভালোবাসা ও অবদানের প্রতিফলন। এখান থেকে গড়ে উঠেছেন অসংখ্য মেধাবী ও দেশপ্রেমী মানুষ। যাঁরা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার সঙ্গে যেসব গুণীজন জড়িত, তাঁদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু, রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: সাইফুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ জেলা সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম, রূপগঞ্জ থানার ওসি এএইচএম সালাউদ্দিন, রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি হাসান আলী, রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম, ঢাকা জেলা সহকারী পুলিশ সুপার জিয়াউদ্দিন বশির, ভুলতা এ্যাপোলো হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. সাদিকুর রহমান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. আলমগীর হোসেন ভুঁইয়া, এফবিসিসিআইয়ের সদস্য গণেশ চন্দ্র সাহা, মারুফ শারমীন স্মৃতি সংস্থার সভাপতি আলহাজ্ব লায়ন মোজাম্মেল হক ভুঁইয়া, ব্যবসায়ী পারভিন আক্তার ভুঁইয়া, রূপগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহবায়ক শাহজাদা ভুঁইয়া, নয়াদিগন্ত পত্রিকার সাংবাদিক শফিকুল আলম ভুইঁয়া, মুড়াপাড়া কলেজের অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমনা, কাঞ্চন সলিমউদ্দিন চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর মালুম, গন্ধর্বপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র সাহা, সরকারি মুড়াপাড়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু শংকর চক্রবর্তী, আয়োজক কমিটির কর্মকর্তা আল-আমিন, সরকার, মনির হোসেন, এসকে মাহমুদ জেসপার প্রমুখ।
পরে মধ্যাহ্নভোজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ব্যান্ড শো-এর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠরানের সমাপ্তি ঘটে।