বিশেষ সংবাদ :
(মনজুরুল ইসলাম সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি)
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার চর চালা পলাশ মার্কেট সংলগ্ন হাসেম প্লাজার সামনে মহাসড়ক ওয়াপদা বাঁধের মূল অংশ রাতের আঁধারে কেটে অবৈধভাবে পাইপ বসানোর চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। প্রভাব খাটিয়ে রাতের নীরবতায় চালানো এই ড্রেজার ভিত্তিক খননকাজে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অভিযুক্ত ব্যবসায়ীর প্রতিনিধি ভুল স্বীকার করলেও পরে রাজনৈতিক নেতার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে পুনরায় কাজ করার হুমকি দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
রাতের আঁধারে গোপনীয় খননকাজ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১ আগস্ট রবিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে রাতের গভীরতার সুযোগ নিয়ে এই অবৈধ কর্মযজ্ঞ চালানো হয়। অভিযুক্ত ব্যবসায়ী হাজী মো: আব্দুল হাশেমের মালিকানাধীন কমপ্লেক্স (হাসেম প্লাজা) সামনের মহাসড়ক খুঁড়ে পূর্ব দিকে ওয়াপদা বাঁধের মাঝখান দিয়ে নলকূপ ড্রেজার মেশিন নামানো হয়। এ সময় প্রায় ১৫ জন শ্রমিকের একটি বিশাল দল কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন বা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মূল রাস্তা ও বাঁধ খনন শুরু করে। গভীর রাতে রাস্তা কাটার শব্দে স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
শ্রমিকদের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা ড্রেজার ও খননকাজের এক শ্রমিক আসলাম গণমাধ্যম ও স্থানীয়দের কাছে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, “আমরা এখানে কাজ করতে এসেছি রাস্তার ভেতর দিয়ে পাইপ ঢুকানোর জন্য। আমাদের সাধারণত দিনের বেলায় কাজ করার নিয়ম থাকলেও জহুরুল ভাই আমাদের আশ্বাস দিয়ে বলেছেন— ‘পুলিশ প্রশাসন এখানে ম্যানেজ রেখেই কাজ করব, তোমাদের কোনো সমস্যা হবে না, রাতেই কাজ করতে হবে।’ তাঁর এত ক্ষমতা ও আশ্বাসের ওপর ভরসা করেই আমি নিয়ম না মেনে রাতে কাজ করতে রাজি হয়েছি।” শ্রমিকের এই বক্তব্যে কাজের নেপথ্যে প্রশাসনিক ম্যানেজ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভুল স্বীকারের পর নেতার ক্ষমতার দাপট
এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়ে শুরুতে অভিযুক্ত কমপ্লেক্সের মালিক হাজী আব্দুল হাশেমের শ্যালক ও কাজের তদারককারী জহুরুল ইসলাম রাতের বেলা গোপনে এই কাজ করার বিষয়টি অননুমোদিত ও ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতি কমে যাওয়ার পর জহুরুল ইসলাম তার অবস্থান পরিবর্তন করেন। তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হাজী আলতাফ হোসেন প্রামানিকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলে পরিচয় দেন এবং ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পুনরায় ওই স্থানে পাইপ বসানোর কাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। আইনের প্রতি এমন বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করায় এলাকায় চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
লাখ লাখ মানুষের জীবন ও সুরক্ষায় মারাত্মক ঝুঁকি
জনবহুল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক এবং ওয়াপদা বাঁধের নিচ দিয়ে এভাবে অপরিকল্পিতভাবে পাইপ ঢোকানোর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়রা। তাদের মতে—
অবকাঠামোগত ধস: এভাবে রাস্তা ও বাঁধের নিচ দিয়ে কৃত্রিমভাবে গর্ত করায় যেকোনো মুহূর্তে ভারি যানবাহন চলাচলের সময় সড়ক ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বন্যা ও প্লাবন আতঙ্ক: বর্ষা মৌসুমে বা উজান থেকে পানির চাপ বাড়লে এই ভাঙন পয়েন্ট দিয়ে পশ্চিম পাশের জনপদে আকস্মিক পানি ঢুকে পড়তে পারে।
জনদুর্ভোগ: ফলস্বরূপ বেলকুচি উপজেলার লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবিক বিপর্যয় ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সচেতন মহলের দাবি
জনস্বার্থের তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে একটি সরকারি মহাসড়ক ও ওয়াপদা বাঁধের ক্ষতিসাধনের এই অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। অবিলম্বে এই অবৈধ পাইপ স্থাপন কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং হাজী মো: আব্দুল হাশেম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন এলাকাবাসী।