বিশেষ সংবাদ :
(নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ)
”বাবা, আমার বুকডা জুড়াইয়া গেসে। যেডা কেউ পারতো না, হেইডা হেগরে ধইরা জেল দিয়া আমাগো শান্তি আনছে।”—রূপগঞ্জের গজারিয়াপাড়া এলাকার সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা রহিমা বেগম যখন আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে এ কথাগুলো বলছিলেন, তখন তাঁর দীর্ঘশ্বাসে মিশে ছিল এক বুক স্বস্তি। যে জনপদ বছরের পর বছর মাদকের থাবায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল, যেখানে সন্ধ্যার পর ভয়ে ঘরের বাইরে যাওয়া যেত না, সেই রূপগঞ্জে আজ স্বস্তির সুবাতাস বইছে। আর এই পরিবর্তনের নেপথ্যে মূল কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম। গত দুই মাসের তাঁর ঝটিকা ও সাহসী পদক্ষেপে বদলে যেতে শুরু করেছে পুরো উপজেলার চিত্র।
অপরাধের শিকড় উপড়ে ফেলতে কঠোর হুশিয়ারি
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ইউএনও সাইফুল ইসলাম এলাকার মাদক কারবারি, ভূমিদস্যু এবং ভেজাল কারবারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের জমি জবরদখল করে আসছিল, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যে ভেজালকারীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—অপরাধ করে রূপগঞ্জে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড় পাওয়া যাবে না। তাঁর এই আপসহীন অবস্থানের ফলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে স্থানীয় অপরাধ সিন্ডিকেট।
দুই মাসে ১৪৫ মাদক কারবারি ও সেবনকারীর সাজা
উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশিকুর রহমান বলেন, মাদকের করাল গ্রাস থেকে তরুণ সমাজকে বাঁচাতে তিনি সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছেন। গত দুই মাসের ব্যবধানে উপজেলাজুড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১৪৫ জন মাদক কারবারি ও মাদকসেবীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শুধু আইন প্রয়োগ করেই তিনি ক্ষান্ত হননি; মাদকবিরোধী জনসচেতনতা তৈরিতেও মাঠে নেমেছেন। তাঁর এই ধারাবাহিক ও কঠোর অভিযানের কারণে রূপগঞ্জের অলিগলি থেকে মাদকের আস্তানাগুলো একে একে গুটিয়ে যেতে শুরু করেছে।
প্রশাসনের চৌকাঠে মিলছে মানবিকতার ছোঁয়া
অন্ধ জুয়েল মিয়া, বৃদ্ধা রাহেলা খাতুন বলেন, একজন কঠোর ম্যাজিস্ট্রেটের রূপের বাইরেও ইউএনও সাইফুল ইসলামের অন্য একটি পরিচয় রয়েছে—তিনি এলাকার অসহায় মানুষের পরম বন্ধু। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে আসা হতদরিদ্র, অসুস্থ ও সহায়-সম্বলহীন মানুষ যখন তাঁর দপ্তরে আসেন, তখন খালি হাতে ফেরেন না। সরকারি তহবিলের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও তিনি অসংখ্য অসহায় পরিবারকে আর্থিক অনুদান, চিকিৎসা সহায়তা ও খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করে চলেছেন। প্রশাসনের শীতল দেওয়াল ভেঙে তিনি সাধারণ মানুষের দুয়ারে পৌঁছে গেছেন এক মানবিক সেবক হিসেবে।
সাধারণ মানুষের আস্থার নতুন ঠিকানা
সেবা নিতে আসা লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক দুর্ভেদ্যতা এবং নানা অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা দূর করতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই কর্মকর্তা। দালালের দৌরাত্ম্যমুক্ত সেবা প্রদান এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক কার্যক্রমে আজ মুখরিত রূপগঞ্জ উপজেলা পরিষদ। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ইউএনও সাইফুল ইসলামের মতো এমন সৎ, কর্মবীর ও সাহসী কর্মকর্তারাই পারেন সমাজ থেকে সব অনিয়ম দূর করে একটি বাসযোগ্য ও সুন্দর জনপদ গড়ে তুলতে। রূপগঞ্জের এই সফল অভিযাত্রা এখন পুরো জেলার মানুষের মুখে মুখে আলোচিত।