বিশেষ সংবাদ :
(নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ)
কৃত্রিম সরিষার তেল বাজার দখল করে নেয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে কলু সম্প্রদায় | সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে ঘানিতে টানা খাটি সরিষার তেল|ফলে খাঁটি সরিষা তেলের ¯^াদ আর পাচ্ছে না মানুষ| আগে দিনরাত গরু দিয়ে কাঠের ঘানির সাহায্যে ফোটায় ফোটায় নিংড়ানো খাঁটি সরিষার তেল বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে মাটির হাড়িতে ফেরি করে এবং হাট-বাজারেও এই তেল বিক্রি করা হতো| এ তেল বিক্রি করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতেন এক শ্রেণীর কলু সম্প্রদায়|
‘কুলু’ শব্দটির সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের তেমন পরিচয় নেই| আজ আর সেভাবে চোখেও পড়ে না কলু সম্প্রদায়কে| আগে গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারে মাটির হাঁড়িতে বিক্রি হতো কাঠের ঘানিতে বানানো খাঁটি সরিষার তেল| হাঁড়ির ঢাকনার নিচে থাকতো তালের বিচির খোলা দিয়ে বানানো বাঁশের হাতলের ওরং| তেল তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ওরংটা ব্যবহৃত হতো| এই খাটি সরিষার তেলের সঙ্গে কলু সম্প্রদায়ের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত|
কুলু হলো তেলের সঙ্গে জড়িত একটি সম্প্রদায়| সরিষা বা তেলবীজ পেষার জন্য পশু দিয়ে চালিত যে দেশীয় যন্ত্রটি তারা ব্যবহার করেন সেটিই ‘ঘানি’| ঘানি টানার জন্য কুলুরা গরু কিংবা ঘোড়া ব্যবহার করেন| এই গরুগুলোকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘বলদ’| কাজের সময় গরুগুলোর চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা হত, যেন পরিশ্রম বেশি করানো যায়| এই কাজ থেকেই উদ্ভব হয় ‘কুলুর বলদ’ প্রবাদটির| আর ঘানি ˆতরি হয় কাঠ দিয়ে, যেখানে এক বিন্দু লোহার অস্তিত্ব নেই| এটা ˆতরি করতে রীতিমতো একটা গাছ লেগে যায়| একেকটি অংশ ˆতরিতে লাগে একেক ধরনের কাঠ|
বানিয়াদী গ্রামটি ছিলো ঘানিতে টানা কুলুর সরিষা তেলের জন্য ঐতিহ্যবাহী| দিন বদলের সাথে সাথে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান| আর নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে| কুলু সম্প্রদায়ও এর প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি| এখন কাঠের ঘানির পরিবর্তে প্রযুক্তির আর্শিবাদে লোহার ঘানিতে ভাঙ্গা হচ্ছে সরিষার সাথে বিভিন্ন দ্রব্যাদি|
ইলেকট্রিক মোটর দ্বারা লোহার এ ঘানি গুলোতে কেবল সরিষায় নয় তিল, তিশি, পাম ও সোয়াবিনও ভাঙ্গা হয়|তবে কোন কোন লোহার মেশিনে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা সরিষার সাথে চালের গুড়া, পিয়াজ, শুকনা মরিচসহ অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রনে ভেজাল সরিষার তেল উৎপাদন করছে|
ভেজাল এ কৃত্রিম তেল দখল করেছে তেলের বাজার| কৃত্রিম তেল তারা কম দামে বিক্রি করতে পারলেও কাঠের ঘানিতে কুলু সম্প্রদায় দিন-রাত পরিশ্রম করে যে খাঁটি সরিষার তেল উৎপাদন করতেন তা কম দামে বিক্রি করতে পারতেন না তারা| ফলে প্রতযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না কুলু সম্প্রদায়|এখন কলু সম্প্রদায় বিলুপ্তপ্রায়|
উপজেলার বানিয়াদী, কাঞ্চনসহ বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে এলাকায় কুলু সম্প্রদায়ের লোকেরা কাঠের ঘানিতে তেল উৎপাদন করতেন| কিন্তু কৃত্রিম সরিষার তেল বাজার দখল করায় তারা এ ব্যবসা বাদ দিয়ে বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন|
কেড়াব গ্রামের আজিজুল বলেন, আমার বাপ-দাদার মূল ব্যবসাই ছিল কাঠের ঘানিতে সরিষার তেল উৎপাদন করা|বর্তমান সময়ে এ তেলে চাহিদা থাকলেও উৎপাদন করে পুষিয়ে উঠা কঠিন| তাই আধুনিক যন্ত্রপাতি দ্বারা তেল মাড়াই করছি|
বানিয়াদীর মজিবর জানান,আগে আমি বাবার সাথে কাঠের ঘানি দিয়ে তেল উৎপাদন করে বাজার বিক্রয় করতাম| বর্তমানে যুগের পরিবর্তনের এ পেশায় তেমন আর পরর্তা (লাভ) না হওয়ায় এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছি |
উপজেলা কৃষি কর্মকতা আফরোজা সুলতানা বলেন, আবাসন চাহিদার ফলে কৃষি জমি বালি ফেলে ভরাট করে ফেলছে| সরিষার উৎপাদন কমে গেছে| প্রযুক্তির বিপ্লবে দেশের প্রায় সব অঞ্চল থেকেই হারিয়ে যাচ্ছে কাঠের ঘানিতে ভাঙা তেল ˆতরির প্রক্রিয়াটি| বিলুপ্ত হচ্ছে ঘানি বা তেলের গাছ| প্রযুক্তির সাথে টিকতে না পেরে পেশা পরিবর্তন করছেন রুলু সম্প্রদায়ের লোকেরা|