বিশেষ প্রতিবেদন :
প্রথমে চাকরি ও পরে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের প্রলোভন দেখিয়ে এক অবসরপ্রাপ্ত সচিবের কাছ থেকে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া প্রতারক চক্রের ০৪ সদস্য সিআইডির হাতে গ্রেফতার হয়েছে। প্রথমে মোটা অঙ্কের বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় কথিত অফিসে। এরপর দেখানো হয় ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের প্রলোভন। এক সপ্তাহের মধ্যে ২০% লাভসহ মূলধন ফিরিয়ে দেওয়ার মৌখিক চুক্তিও সম্পাদন করা হয়। এরপর ব্যবসায় বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে ধাপে ধাপে ৫৪ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। কিন্তু এতেও ক্ষান্ত হয়নি প্রতারক চক্র, কোনো প্রকার লাভ না দিয়েই আরও অর্থ বিনিয়োগ করার জন্য ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করতে থাকলে এক পর্যায়ে ভুক্তভোগী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন এবং এ বিষয়ে মামলা করেন। বাদী মামলায় অভিযুক্তদের তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য উল্লেখ করতে না পারলেও প্রতারক চক্রের ০৪ সদস্য শেষমেশ ধরা পড়েছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)-এর হাতে।
অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার কাছ ৫৪ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে প্রতারক চক্রটি। পরে বাদীর দায়ের করা মামলার তদন্তেপ্রাপ্ত আসামী হিসেবে অর্থ আত্মসাৎকারী চক্রের ০৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হল- (১) মো. তোফায়েল হোসেন ওরফে রতন (৬৮), পিতা- মৃত. আব্দুল খালেক মোল্লা, মাতা- মৃতা মাবিয়া বেগম, সাং-দক্ষিণ হলোদিয়া, পোস্ট- হলোদিয়া, থানা- লৌহজং, জেলা-মুন্সীগঞ্জ; (২) মো. লিটন মুন্সী (৬০), পিতা- মো. আব্দুস রশিদ মুন্সী, মাতা- রেনু বেগম, সাং- শফিপুর, পোস্ট- সোনামদ্দিন বন্দর, থানা- মূলাদী, জেলা-বরিশাল; (৩) মো. বাবুল হোসেন (৫৫), পিতা- মৃত. ফিরোজ মিয়া, মাতা- আনোয়ারা বেগম, সাং- টেককাথোরা, পোস্ট- সালনা, থানা- গাজীপুর সদর, গাজীপুর; ও(৪) মো. নুরুল ইসলাম (৩৯), পিতা- মো. আমির হোসেন, মাতা-জাহানারা বেগম; সাং- এ/পি-২০/২, এভিনিউ-১, রোড-১, ব্লক-ই, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬।
গত ১৯/০৪/২০২৬ খ্রি. তুরাগ (ডিএমপি) থানাধীন দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করে সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) এর সাইবার ইন্টেলিজেন্স এন্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্টের একটি চৌকশ দল আভিযানিক দল। এসময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কার্যে ব্যবহৃত ০৯ টি মোবাইল ফোন, ১২টি সিম কার্ড, ০৫ টি মানি রিসিপ্ট, ০২টি ভিন্ন ভিন্ন বিলের কাগজ ও বিদেশি মুদ্রা মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়।
বাদী মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন যে, তিনি ২০২৪ সালে অতিরিক্ত সচিব পদ মর্যাদা হতে পিআরএল গ্রহণ করেন। পিআরএল থাকাকালীন ঐ বছরের অক্টোবর মাসে বাদীকে একটি অজ্ঞাত মোবাইল নম্বর থেকে কল করে রাজধানীর মিরপুরের একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (এডমিন) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী বাদী পরবর্তীতে সেই ঠিকানার অফিসে উপস্থিত হলে প্রতারক চক্রের ০১ জন সদস্য জীবন বৃত্তান্তসহ অন্যান্য কাগজাদি পরীক্ষাপূর্বক বাদীর চাকুরীর বিষয়টি নিশ্চিত করে। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে উক্ত অফিসে হাজির হলে প্রতারক চক্রের ০২ সদস্য বাদীকে চাকুরির পাশাপাশি ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের প্রস্তাব দিলে তাদের মধ্যে মৌখিক চুক্তি হয়। মৌখিক চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এক সপ্তাহের মধ্যে ২০% মুনাফাসহ মূলধন ফেরত দেয়ার প্রলোভন দেওয়া হয় । এরপর প্রতারক চক্র সুকৌশলে অল্প দিনের মধ্যেই ৫৪ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। এক সপ্তাহ পর বাদী চুক্তি অনুযায়ী টাকা ফেরত চাইলে না দিয়ে চক্রটি টালবাহানা করার পাশাপাশি সময়ক্ষেপন করতে থাকে। এক পর্যায়ে পূর্বের সমূদয় অর্থ ফেরতের আশ্বাস দিয়ে আরো অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। এতে বাদী প্রতারণার শিকার হয়েছেন মর্মে বুঝতে পেরে পল্লবী (ডিএমপি) থানার মামলা নং- ১০, তারিখ-০৭/১২/২০২৪ খ্রি.; ধারা- ৪০৬/৪২০ পেনাল কোড ১৮৬০ রুজু করেন।
এজাহারে শুধু প্রতারক চক্রের সদস্যের সংক্ষিপ্ত নাম, আনুমানিক বয়স ও শারীরিক বিবরণ ব্যতীত অন্য কোনো বিস্তারিত তথ্য বাদী প্রদান করতে না পারলেও মামলাটি তদন্তকালে মামলার ডকেটে সংযুক্ত তথ্যাদির পাশাপাশি সংগৃহীত অন্যান্য তথ্য প্রাযুক্তিক বিশ্লেষণে (১) মো. লিটন মুন্সী (৬০), (২) মো. বাবুল হোসেন (৫৫), (৩) মো. তোফায়েল হোসেন ওরফে রতন (৬৮) এবং (৪) মো. নুরুল ইসলাম (৩৯)দেরকে শনাক্ত করে সাইবার পুলিশ সেন্টার।
মামলাটি তদন্তকালে জানা যায়, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চপদস্থ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের পদমর্যাদা ও মোটা অঙ্কের বেতনের পাশাপাশি উচ্চ মুনাফার লোভ দেখিয়ে বিনিয়োগের নামে অর্থ আত্মসাতের প্রতারণা করে আসছিল। গ্রেফতারকৃত অভিযুক্তরা অত্যন্ত সুকৌশলে রাজধানীর মিরপুর ও উত্তরা এলাকায় অফিস ভাড়া নিয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতো। এই চক্রের সাথে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা সে সংক্রান্ত তথ্যাদির জন্য গ্রেফতারকৃতদের পর্যাপ্ত পুলিশ প্রহরা ও সতর্কতার সাথে ০৭ (সাত) দিনের রিমান্ডের আবেদনসহ বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
মামলাটি তদন্তকালে গ্রেফতারকৃত মধ্যে নিম্নোক্ত অভিযুক্তদের নামে একাধিক মামলার তথ্য পাওয়া যায়-
(১) তোফায়েল হোসেন ওরফে রতন (৬৮) এর নামে রমনা মডেল থানা (ডিএমপি) এর মামলা নং-১৮, তারিখ- ১৯/০৩/২০২০ খ্রি. ধারা- ৪২০/৪০৬ পেনাল কোড- ১৮৬০; মোহাম্মদপুর থানা (ডিএমপি)এর মামলা নং- ১০৮, তারিখ- ২৫/০৩/২০২১ খ্রি. ধারা- ৪২০/৪০৬ পেনাল কোড- ১৮৬০ ; উভয় মামলায় এজাহারনামীয় অভিযুক্ত;
(২) মো. লিটন মুন্সী (৬০) এর নামে বরিশাল জেলার মুলাদী থানার মামলা নং- ১৭, তারিখ- ২৭/০৩/২০২৬ খ্রি., ধারা-১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/৫০৬(২) পেনাল কোড- ১৮৬০ এর এজাহারনামীয় অভিযুক্ত; পল্লবী থানা (ডিএমপি) এর মামলা নং-১০, তারিখ- ০৭/১২/২০২৪ খ্রি., ধারা-৪০৬/৪২০ পেনাল কোড- ১৮৬০ এর তদন্তে সন্দিগ্ধ মর্মে তথ্য পাওয়া যায়।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। প্রতারণা চক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে। এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে সর্বসাধারণকে সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধের পাশাপাশি অচেনা ব্যক্তি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পূর্বে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সত্যতা যাচাই এবং অপরিচিত কোনো নাম্বার থেকে ফোন কলের মাধ্যমে এ ধরনের চাকুরির পাশাপাশি ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব ও আর্থিক লেনদেন থেকে বিরত থাকার অনুরোধ ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
Leave a Reply