বিশেষ প্রতিবেদন :
ঢাকা, (০৭ জুলাই, ২০২৬ খ্রি.):
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এর সঙ্গে গতকাল (০৬ জুলাই, সোমবার) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব পিস অপারেশনস (DOP)-এর আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল (ইউএসজি) জঁ-পিয়েরে লাক্রোয়া (Jean-Pierre Lacroix) এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উভয় পক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ পুলিশের অবদান, দ্রুত নিয়োজন সক্ষমতা যাচাই (RDL Verification), কঙ্গো (MONUSCO) মিশন থেকে বাংলাদেশি নারী এফপিইউ (FPU)-এর প্রত্যাহারের প্রেক্ষিতে নতুন মিশনে প্রতিস্থাপন, জাতিসংঘ সদরদপ্তর ও মাঠপর্যায়ে নীতি-নির্ধারণী পদে বাংলাদেশিদের নিয়োগ, আইপিও (IPO) ডেপ্লয়মেন্ট এবং ভবিষ্যৎ বিশেষায়িত সক্ষমতা বৃদ্ধি সহ দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের এক বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত অংশীদার। এ পর্যন্ত ২৬টি দেশের ২৭টি শান্তিরক্ষা মিশনে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। তিনি বলেন, অন্যতম শীর্ষ পুলিশ অবদানকারী দেশ (PCC) হিসেবে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের যেকোনো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতা বাড়াতে নানামুখী বিনিয়োগ ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের দ্রুত সাড়াদানের সক্ষমতাকে আরও জোরদার করতে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য দুটি ফর্মড পুলিশ ইউনিটের (FPU) র্যাপিড ডেপ্লয়মেন্ট লেভেল (RDL) যাচাইকরণের প্রস্তাব ইতিমধ্যে জাতিসংঘ পুলিশ বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে। ইউনিট দুটি জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম (Major Equipment), নিজস্ব রসদ ব্যবস্থাপনা (Self-Sustainment) এবং দক্ষ জনবলে সম্পূর্ণ সুসজ্জিত। মন্ত্রী এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে ডিপার্টমেন্ট অব পিস অপারেশনস (DPO)-এর আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
বৈঠকে মন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কঙ্গোর মোনুস্কো (MONUSCO) মিশন থেকে গত অক্টোবর ২০২৫-এ স্বল্প সময়ের নোটিশে ১৮০ সদস্যের বাংলাদেশি নারী এফপিইউ (BANFPU) প্রত্যাহারের বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, অন্যান্য মিশন যেমন—সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক (MINUSCA) বা দক্ষিণ সুদানে (UNMISS) বিভিন্ন দেশের মধ্যে আনুপাতিক হারে কমানো হলেও, কঙ্গোতে কেবল বাংলাদেশের পুরো ইউনিটটি প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা সমতা ও ন্যায্যতার নীতি পরিপন্থী। বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দক্ষিণ সুদান, আবেয়ি (Abyei) বা সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে একটি নতুন বাংলাদেশি এফপিইউ মোতায়েনের জন্য তিনি আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানান।
শান্তিরক্ষা মিশনের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বাংলাদেশের অবদান বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সদরদপ্তর এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন মিশনসমূহের শীর্ষ নেতৃত্ব ও বিশেষায়িত পেশাদার পদে (P-Level এবং D-Level) যোগ্য ও দক্ষ বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তাদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ শান্তি মিশনের পরিবর্তিত চাহিদাকে ধারণ করতে সক্ষম এমন অত্যন্ত যোগ্য পুরুষ ও নারী কর্মকর্তা প্রদানে সর্বদা প্রস্তুত।
বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৪ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সিলেকশন অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট টিম (SAAT) পরীক্ষায় ১০৭ জন কর্মকর্তা উত্তীর্ণ হলেও এখনো ৮৫ জন কর্মকর্তা নিয়োজনের অপেক্ষায় আছেন। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও কঙ্গোতে বাংলাদেশি ইন্ডিভিজুয়াল পুলিশ অফিসার (IPO)-এর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায়, সেখানে ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ এবং অপেক্ষমাণ কর্মকর্তাদের দ্রুত পদায়নের অনুরোধ জানানো হয়। একইসঙ্গে, বর্তমান তালিকার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলায়, আগামী সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশে পরবর্তী ‘সাট’ (SAAT) পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলকে সময়োচিত সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।
জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জঁ-পিয়েরে লাক্রোয়া বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ অবদান, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি কঙ্গো মিশনের ভারসাম্য ও সমতার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আশ্বাস দেন এবং বাংলাদেশের উত্থাপিত যুক্তিসঙ্গত দাবিগুলো পূরণে ও বিশেষায়িত পুলিশ দল গঠনে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।