বিশেষ প্রতিবেদন :
অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ হতে নিজেদের কমিশন কর্তনের পর বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে পাচার চক্রের আরও ০৩ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)’র সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। সাইবার পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট এন্ড ডেভেলপমেন্ট এর একটি চৌকশ আভিযানিক দল গত ১৫/০৬/২০২৬ খ্রি. তারিখে নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে তাদেরকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃতরা হলো- (০১) মো. রায়হান খান (২১), পিতা- মো. মনির খান, মাতা- ফাতেমা বেগম, সাং- চরনগরদী, ডাকঘর-গয়েরপুর, থানা- পলাশ, জেলা-নরসিংদী; (০২) মো. পাভেল রহমান ভূইয়া (২৩), পিতা- মো. আজমল ভূইয়া, মাতা- পারভীন সুলতানা, সাং- ভাগদী, ডাকঘর+থানা+জেলা-নরসিংদী ও (০৩) আবু জোবায়ের সানি (৩৬), পিতা- মাওলানা আবু হোরায়রা, মাতা- মোসা. লুৎফুন্নাহার, গ্রাম- ভিটি পরমেশ্বরদী, নোয়াগাঁও, ডাকঘর- লক্ষীবরদী, থানা- সোনারগাঁও, জেলা- নারায়ণগঞ্জ।
মো. রায়হান খান (২১) ও মো. পাভেল রহমান ভূইয়া (২৩)দ্বয়কে নরসিংদী জেলার নরসিংদী সদর থানাধীন চিনিশপুর, জেলখানা মোড়ের জেলখানা রোড হতে এবং আবু জোবায়ের সানি (৩৬)কে নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থানাধীন আড়াইহাজার বাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সিপিসি নিয়মিত সাইবার মনিটরিং করাকালীন দেখতে পায় যে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অভ্যন্তর ও বিদেশ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন অনলাইন বেটিং (জুয়া) ওয়েবসাইটের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসবক জুয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ অন্যান্য খেলা ও অনলাইন ক্যাসিনোকে কেন্দ্র করে টাকার বিনিময়ে বেটিং পরিচালিত হচ্ছে। বেটিং সাইটে ব্যবহৃত বিভিন্ন এজেন্টদের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ব্যাংক হিসাবসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করে সিআইডি বাদী হয়ে পল্টন (ডিএমপি) থানায় মামলা নং-২০, তারিখ- ১৭/০৫/২০২৬ খ্রি., ধারা- সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ এর ২০(২)/২১(২)/২২(২)/ ২৪(২)/২৭(২)/২৯(২) রুজু করে। মামলা রুজুর পর সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
মামলাটির তদন্তে জানা যায়, অনলাইন বেটিংয়ে অংশগ্রহণের জন্য প্রথমে নির্দিষ্ট অনলাইন সাইটে একটি একাউন্ট (ওয়ালেট) খুলতে হয়। অভিযুক্তরা বেটিংয়ে অংশগ্রহণকারীদের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়), ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ জমা দিতে উৎসাহ ও নির্দেশনা প্রদান করতো। অংশগ্রহণকারীদের জমাকৃত অর্থের বিপরীতে তাদের বেটিং অ্যাকাউন্টে ই-মানি বা ভার্চুয়াল ব্যালেন্স যুক্ত হলে পরবর্তীতে তা অনলাইন জুয়ার কাজে ব্যবহৃত হতো।
তদন্তে আরও জানা যায়, গ্রেফতারকৃত অভিযুক্তরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইন বেটিংয়ের এজেন্ট নিয়োগ করে তাদের এমএফএস ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করে সেগুলো বেটিং সাইটে ব্যবহার করছিল। জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ হতে নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্টরা তাদের কমিশন কেটে রাখার পর বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে পাচার করছিল মর্মে তথ্য পাওয়া যায়। মামলাটির তদন্তে অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত এজেন্ট নম্বরের সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনলাইন বেটিং কার্যক্রমে ব্যবহৃত এজেন্ট সিম ও আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। তারা নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে এজেন্ট সিম ও হিসাব বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট সরবরাহ করেছিল, যা অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত হতো মর্মে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়। গ্রেফতারকৃত মো. রায়হান খান ও আবু জোবায়ের সানি (৩৬) নিজ নামে নিবন্ধিত এজেন্ট সিম উক্ত অনলাইন জুয়ার সাইটে সক্রিয় রেখে কমিশন নিতেন। মো. পাভেল রহমান ভূইয়া (২৩) বিভিন্ন এজেন্ট সিম সংগ্রহ করে চক্রের নিকট সরবরাহের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছিল। আর এসব এজেন্ট সিম অনলাইন বেটিং সাইটে অর্থ জমা ও উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মর্মে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়। গ্রেফতারকৃতদেরকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলমান।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন, অর্থপাচার কার্যক্রম এবং এ চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের লক্ষ্যে সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য যে , ইতোপূর্বে এই মামলায় সম্পৃক্ততা পাওয়া যাওয়ায় সিআইডির একটি চৌকস আভিযানিক দল গত ০৭/০৬/২০২৬ খ্রি. তারিখে টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে অনলাইন জুয়া ও অবৈধ অর্থপাচার চক্রের সদস্য যথাক্রমে (০১) মো. সোলায়মান (৪৭), (০২) মো. সাগর মিয়া (২৮) ও (০৩) মো. জুয়েল রানা (৩২) নামীয় ০৩ সদস্যকে গ্রেফতারপূর্বক বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।