বিশেষ সংবাদ :
(প্রতিবেদক এম এ হান্নান)
ভোরের আলো ফোটার আগেই নাগরপুরের মেঠো পথে যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল তিন দশকের পুরোনো স্মৃতিরা। ‘আলোকিত হও, আলোকিত করো’—এই একটিমাত্র চিরন্তন বাণীকে বুকে ধারণ করে, বাৎসরিক নৌকা ভ্রমণের রেশ কাটতে না কাটতেই আবার একসূত্রে বাঁধা পড়ল একঝাঁক প্রাণোচ্ছল প্রাণ। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ১৯৯০ সালের এসএসসি ব্যাচের বন্ধু-বান্ধবীরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন এক নতুন গল্পের খোঁজে। গন্তব্য—সবুজ পাহাড়ে ঘেরা রূপসী সিলেট।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সন্ধ্যায় শুরু হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা তিন রাত ও দুই দিনের এই পথচলা কেবল কোনো সাধারণ সফর ছিল না; তা ছিল হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর কৈশোরকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার ব্যাকুল আকুতি। ৪২ জন সহপাঠীর এই স্মৃতির মিছিলে যেন বয়সের ভার মুছে গিয়ে ফিরে এসেছিল সেই পুরোনো স্কুলের দিনগুলো।
যাত্রার প্রথম সকালে তাঁদের স্বাগত জানায় প্রকৃতি। ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা হিমশীতল স্ফটিক জলরাশি আর চা বাগানের সবুজ গালিচায় রূপসী সিলেটের প্রেমে পড়েন সবাই। দিনভর রাতারগুলের জলজ বনের ছায়ায় ছায়ায় কেটে যায় রূপকথা সম দৃশ্যপট। পরদিনের সূর্যোদয় তাঁদের নিয়ে যায় জাফলংয়ের জিরো পয়েন্টে। সেখানে মায়াবী ঝরনার শব্দমালা, ঝুলন্ত ব্রিজের রোমাঞ্চ আর বিকেলের শান্ত লালাখালের নীল জলে ভেসে চলা—সব মিলিয়ে এক মায়াবী জগতের সৃষ্টি হয়। খাসিয়া পল্লীর জনজীবনও তাঁদের অভিজ্ঞতায় যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
এই অনবদ্য আয়োজনের পেছনে নেপথ্য কারিগর হিসেবে পরম মমতায় পুরো সফরটি সুতোয় বেঁধে রেখেছিলেন আয়োজক কমিটির প্রধান সমন্বয়ক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আমজাদ হোসেন রতন, সাবেক সেনা সার্জেন্ট নজরুল ইসলাম খান এবং মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক শওকত আলী মিয়া। বন্ধুত্বের এই মহামিলনে। সফরসঙ্গী হয়েছিলেন সিলেটে কর্মরত সিসিকের প্রধান ডা. জাহিদুল ইসলাম সুমন—যার সার্বিক সহযোগিতা পুরো ভ্রমণকে করেছিল অনায়াস ও স্বাচ্ছন্দ্যময়।
এছাড়াও ছিলেন সিলেট নার্সিং ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ডা. তামান্না খান, সিলেট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম এবং পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ মিয়াসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিষ্ঠিত ৪২ জন বন্ধু-বান্ধবী। কাজের ব্যস্ততা, পদমর্যাদা আর জীবনের নানা হিসাব-নিকাশ ভুলে তাঁরা সবাই মিশে গিয়েছিলেন বন্ধুত্বের এক অভিন্ন রঙে।
যাত্রার প্রতিটি মোড়ে স্থানীয় ট্যুরিস্ট বিভাগ, প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের আন্তরিক সহযোগিতা ভ্রমণটিকে করে তুলেছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। সফরের শেষে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে সিলেট সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি প্রকাশ করা হয় গভীর শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা।
ফেরার পথে সিলেট ছেড়ে এলেও, নাগরপুরের ‘এসএসসি ৯০’ ব্যাচের বন্ধুরা সাথে করে নিয়ে এসেছেন সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ পানি আর বন্ধুদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় বোনা একমুঠো অমর অনুভূতি। জীবনের জলছবিতে এই সিলেট সফর চিরকাল রঙিন হয়ে থাকবে।