বিশেষ সংবাদ :
(নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ)
“ ওষুধ থাকে শহরে, মানুষ মরে বেঘোরে। পোলাডারে সাপে কামড় দিছিল। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিছিলাম। ধরল ই না।কয় তাড়াতাড়ি ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়া যান।” এমনি করে কথাগুলো বলেন নগরপাড়া এলাকার আলাউদ্দিন মিয়া। আলাউদ্দিনের মত দুলু মিয়া , মমিন আলীরাও একই অভিযোগ করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে।
প্রকৃতিতে বর্ষা কাল চলছে। সাপের উপদ্রবও বৃদ্ধি পেয়েছে। সাপের কামড়ের পর জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান নির্ধারণ করে দেয় মাত্র একটি ঘন্টা, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’। প্রতি বর্ষা সৌসুমে সাপের কামড়ে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও, কার্যকর চিকিৎসা না পেয়েই অকালমৃত্যু হচ্ছে জেলার গ্রামীণ জনপদের মানুষদের। বিষধর সাপের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত মানুষ যখন জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিভেনমের খোঁজে স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে ছোটেন, তখন সেখানে কেবলই ‘নাই’ শব্দ। তবে হাসপাতালের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, আন্টিভেনর মজুদ আছে। সমস্যা নেই।
স্থানীয় মানুষের ভাষ্য, আঞ্চলিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রেকর্ড বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, গত এক দশকে (২০১৬-২০২৬) রূপগঞ্জে সাপের কামড়ে ৪৩ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে এ সংখ্যা আরো বেশি বলে ধারণা স্থানীয়দের।
সরেজমিনে ঘুরে ও তথ্য-উপাত্তের হিসেবে, জেলায় সাপের হটস্পট হিসেবে রয়েছে রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া, কামশাইর, দাউদপুরসহ শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী এলাকায় সাপের উপদ্রব বেশি। ২০২৫ সালের ২ জুন মুক্তিশপুর গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে কবির হোসেন মারা যান। একই বছরের ২৭ জুন নীলকান্দা রূপনগর এলাকার মুসা মিয়ার ছেলে শাকিল মিয়া ও জুলাই মাসে জাকির হোসেনের মৃত্যু হয়। হাইজাদী ইউনিয়নের সিংহদী এলাকার দাউদুরের কিশোর ছেলে তামিম মিয়া, একই বছরের ৯ জুন দুপ্তারা পাল্লা এলাকার তোফাজ্জলের চার বছরের শিশু ছেলে তামিম হাসান, ৮ অক্টোবর নাগের চর এলাকার শাহীদা বেগমের মৃত্যু হয়।
হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জেলা সদর হাসপাতালে কাগজে-কলমে অ্যান্টিভেনম থাকলেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগী অনুপাতে অ্যান্টিভেনমের সংকট আছে। তবে হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, অ্যান্টিভেনমের মজুদ রয়েছে। কোন সমস্যা নেই। কোনো রোগী হাসপাতালে এলে চিকিৎসকেরা আইনি ও পেশাগত ঝূঁকি এড়াতে সরাসরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘রেফার’ করে দেন। রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাদল কুমার সাহা বলেন, আমাদের এখানে রোগী আসে মোটামুটি।অনেক রোগী ঢাকা মেডিক্যাল কিংবা অন্য হাসপাতালে চলে যায়। যার ফলে সঠিক পরিসংখ্যান থাকে না। আবার অনেকে ওঝার চিকিৎসা নেয়, ফলে সেটার পরিসংখ্যান থাকে না।
রূপগঞ্জ উপজেলার প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সজল কুমার বলেন, সাপের এই আকস্মিক বিস্তার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত মানুষের ˆতরি পরিবেশগত বিপর্যয়, শিকারী প্রাণী বিলুপ্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এক যৌথ ও মারাত্মক পরিণতি।