বিশেষ সংবাদ :
(নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ)
শরতের ভোরে খালবিলে ফুটে থাকা শাপলার সৌন্দর্য্যে বদলে যেত গ্রামের চেনা দৃশ্য। সাদা-গোলাপি শাপলার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল গ্রামীণ মানুষের জীবন ও জীবিকা। অনেকের কাছে শাপলা ˆশশবের সোনালি স্মৃতিরও অংশ। রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার বিল, ডোবা ও নদীতে এ সময় ফুটে থাকত শাপলা। কেউ পানিতে নেমে শাপলা তুলত, কেউ নৌকায় ঘুরতে গিয়ে ফুল সংগ্রহ করত। আবার কারও জীবিকার অবল¤^ন ছিল এই শাপলা।
“সারা দিন বিল থেকে শাপলা তুলতাম। পরের দিন উপজেলার বিভিন্ন হাটে বিক্রি করতাম। ভালই ইনকাম অইত(হত)। মাঝে মধ্যে রাজধানীর রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, মেরাদিয়া, মাদারটেক, বাসাব, ডেমরা, মাতুয়াইল, কোনাপাড়ায় নিয়েও শাপলা বিক্রি করতাম। শাপলা বিক্রি করেই ৩ ছেলে ও ৪ মেয়েকে বড় করেছি। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। ছেলেরাও চাকরি বাকরি ও ব্যবসা বাণিজ্য করছে।কিন্তু এখন তো আর শাপলা চোখেই দেখি না। থাকবই বা কোথা থেকে? আবাসন কোম্পানীগুলো বালি ফেলে খাল বিলগুলো ভরাট করে ফেলেছে। এখন তো বিলে বালু আর বালু।” এমনি করে কথাগুলো বলেন, উপজেলার মশুরী এলাকার কাদির মিয়া।
অ¯^াভাবিক হারে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে খাল-বিল, পুকুরসহ বিভিন্ন জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা। একসময় রূপগঞ্জের গ্রাম-গঞ্জের খাল-বিল ও পুকুরে যেদিকে চোখ যেত, সেদিকেই দেখা মিলত শাপলার। বর্ষা ও শরতে শাপলার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতেন মানুষ। তবে জলাশয় ভরাট ও পরিবেশের নানা পরিবর্তনের কারণে সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত।
শাপলা সাধারণত অগভীর ও আবদ্ধ জলাশয়, খাল-বিল ও পুকুরে জন্মে। বর্ষা ও শরৎকাল এ ফুল জন্মানোর উপযুক্ত সময়। ফুলটি সাদা, গোলাপি, নীল ও বেগুনিসহ বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশের জাতীয় ফুলের মর্যাদা পেয়েছে সাদা শাপলা।
ব্রাইট শিশু কানন স্কুলের শির্ক্ষাথী নাফিসা ইসলাম মাইশা বলেন, বাস্তবে দেখিনি, তবে বইয়ে জাতীয় ফুল শাপলার ছবি দেখেছ। বাড়ির পাশের বিলে তো পানিই নেই, শাপলা জন্মাবে কিভাবে? চারিদিকে শুধু বালু আর বালু। ঘর থেকে বের হলে বাতাসে চোখে মুখে বালি ডুকে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার জলাশয়ে এখন শাপলার দেখা মেলে কম। হাতেগোনা কিছু জলাশয়ে শাপলা ফুটতে দেখা গেলে তা দেখতে ভিড় করেন স্থানীয় মানুষ। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের কাছেই শাপলা জনপ্রিয়। কোথাও কোথাও শাপলা মানুষের খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। শাপলার ঢ্যাপ দিয়ে এখনো কিছু এলাকায় ˆখজাতীয় খাবার ˆতরি করা হয়।
আবুল কাজী বলেন, বিলে ডুব দিয়ে শালুক তুলতাম। আর সিদ্ধ করে খাইতাম। সেই মজা। এখন তো শাপলা চোখেই দেখি না। ভূমিদস্যুরা বালি ফেলে জলাশয় ভরাট করে ফেলেছে। তাই জাতীয় ফুল শাপলা এখন হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, জলাশয় ভরাট করে বাড়িঘর নির্মাণ, মাছের ঘের ˆতরি এবং জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে শাপলার বিস্তার কমে যাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরোজা সুলতানা বলেন, শুধু বাংলাদেশেই নয়, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারেও পুকুর ও বাগান সাজাতে শাপলা জনপ্রিয়। সাদা শাপলা বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ইয়েমেন, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, ক¤ে^াডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের পুকুর ও হ্রদে দেখা যায়।
তিনি আরো বলেন, শাপলা সাধারণত ভোরে ফোটে এবং দিনের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর পাপড়ি বন্ধ হয়ে যায়।শাপলার পাতা পানির ওপর ভেসে থাকে এবং ফুল ও পাতার ডাঁটা পানির নিচে থাকা মূলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। পাতাগুলো গোল ও সবুজ রঙের।
একসময় বছরের প্রায় সব সময় শাপলা ফুটতে দেখা গেলেও এখন সেই দৃশ্য আর তেমন চোখে পড়ে না। বর্ষা ও শরৎকালে এ ফুল বেশি দেখা যায়।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শাপলার ছবি দেশের মুদ্রা, নোট ও বিভিন্ন সরকারি দলিলপত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। জলাশয় রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে জাতীয় ফুল শাপলার ¯^াভাবিক বিস্তার আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।