বিশেষ প্রতিবেদন :
ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য নারীকে ইতালিতে পাঠানোর মতো মানবপাচারের অভিযোগে এক সংঘবদ্ধ চক্রের ০৭ সদস্যকে গ্রেফতার অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এছাড়াও চক্রটির বিরুদ্ধে রয়েছে ইতালিতে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং জালিয়াতির মাধ্যমে মানবপাচারের অভিযোগও।
গত ২০/০৭/২০২৬ খ্রি. তারিখে সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) একটি চৌকস দল তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর গুলশান থানাধীন গুলশান-১ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেফতার করে। এ বিষয়ে গুলশান (ডিএমপি) থানায় মামলা নং- ৩১, তারিখ- ২১/০৭/২০২৬ খ্রি., ধারা- মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন- ২০২৬ এর ১৬/১৯/২২ তৎসহ পেনাল কোড- ১৮৬০ এর৪০৬/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪৮৪ রুজু হয়েছে।
সিআইডি্র মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেফতার করে। অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের অফিস থেকে ৩টি সিপিইউ, ১টি এইচপি ল্যাপটপ, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা ৫৬টি পাসপোর্ট, সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহৃত ১৫৩টি সিল, ১টি লোহার তৈরি এম্বোস সিল এবং নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হলেন-
(০১) মো. বেলায়েত হোসেন (৪০), পিতা- মো. লোকমান হোসেন, মাতা- মোছা. শাহানারা বেগম, সাং- জয়পুরা;
(০২) নাজমুল হাসান (১৯), পিতা- মৃত মনির হোসেন, মোছা. সামসুনাহার, সাং-দিশুয়া;
(০৩) মেহেদী হাসান (৩৭), পিতা- মৃত রফিকুল ইসলাম, মাতা- মোছা. দেলোয়ারা বেগম, সাং-জয়পুরা;
(০৪) মো. সোলাইমান সুমন (৩২), পিতা- এম,এ মো. আব্দুস সাত্তার, মাতা- মোছা. রহিমা বেগম, সাং- রতনপুর;
(০৫) ফজলে রাব্বী (২৭), পিতা- মৃত সিরাজুল ইসলাম, মাতা- পারভিন বেগম, সাং- জয়পুরা;
সর্ব থানা- রামগঞ্জ, সর্ব জেলা- লক্ষীপুর;
(০৬) মো. তৌহিদুর রহমান (২৪), পিতা- সাইফুল মোল্লা, মাতা- রেকসনা, সাং- আন্ডারচর, (বড় মোল্লাবাড়ী), থানা- কালকিনী, জেলা- মাদারীপুর এবং
(০৭) কাওসার হোসেন (৪২), পিতা- মৃত আমির হোসেন, মাতা- মোছা. নাসরিন আক্তার, সাং- বি/৬. লালকুটি ৩য় কলোনি, মিরপুর-০১, মাজার রোড, থানা- দারুস সালাম , ঢাকা।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায় যে, ভুক্তভোগী বাদীর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে ইতালিতে যাওয়ার আশায় বাদী দীর্ঘদিন ধরে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করে আসছিলেন। একপর্যায়ে ইতালির দূতাবাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পাসপোর্ট জমা দেন। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ইতালির দূতাবাস থেকে তাকে ফোন করে পাসপোর্ট নবায়নের বিষয়ে অবহিত করা হয়। পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য তিনি দূতাবাসে গেলে সেখানে অত্র মামলার এজাহারনামীয় ০২ নং অভিযুক্ত নাজমুল হাসানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নাজমুল নিজেকে পাসপোর্ট নবায়নসহ ইতালির ভিসা করে দেওয়ার কাজে সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট নবায়ন করে দেওয়ার আশ্বাস দেয়। পরবর্তীতে নাজমুল ওই নারীকে রাজধানীর গুলশান-১ এলাকার একটি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায় এবং সেখানে প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে অত্র মামলার এজাহারনামীয় ০১ নং অভিযুক্ত মো. বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেয়।
অভিযুক্তরা তাকে ইতালিতে নেওয়ার জন্য ভিসা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগী বাদীর সঙ্গে আর্থিক চুক্তি করে। যেখানে ভিসা হয়ে গেলে চুক্তি অনুযায়ী সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করতে হবে বলে উল্লেখ ছিল। পরবর্তীতে এ বছরের ১৫ এপ্রিল ভুক্তভোগীর মোবাইলে একটি বার্তা আসে এবং বিষয়টি নাজমুল হাসানকে জানালে নাজমুল বাদীকে ইতালির দূতাবাসে যাওয়ার জন্য বলে। পরদিন ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বাদী ইতালির দূতাবাস থেকে তার পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বাইরে বের হলে নাজমুলসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজন ব্যক্তি তার কাছে চুক্তির টাকা দাবি করে। তার কাছে তাৎক্ষণিকভাবে টাকা না থাকায় অভিযুক্তরা জোরপূর্বক তার পাসপোর্ট নিয়ে নেয়। পাসপোর্ট ফেরত পাওয়ার জন্য এবং ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আশায় তিনি অভিযুক্তদের দেওয়া ব্যাংক হিসাবে ১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ১১ মে ২০২৬ তারিখে আরও ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা, সর্বমোট ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা প্রদান করেন। টাকা দেওয়ার পরের দিন অভিযুক্তরা তাকে তার পাসপোর্ট ফেরত দেয়।
পরবর্তীতে ভুক্তভোগীর প্রবাসী স্বামী তার স্ত্রী (মামলার বাদী) ও সন্তানদের ইতালিতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটের টিকিট বুকিং করেন। নির্ধারিত তারিখে বাদী তার সন্তানদের নিয়ে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে গেলে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা জানান, তার পাসপোর্টে সংযুক্ত ইতালির ভিসা ব্যবহার করে তার পরিবর্তে অন্য একজন অজ্ঞাতনামা নারী ইতোমধ্যে ২৪/০৪/২০২৬ খ্রি. তারিখে ইতালি চলে গেছেন। এই তথ্য শুনে ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন, তার পাসপোর্ট ও ভিসা ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে অন্য একজনকে ইতালিতে পাঠানো হয়েছে এবং সংঘবদ্ধ চক্রটি প্রতারণার মাধ্যমে তার কাছ থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে। পরবর্তীতে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে তিনি সিআইডির মানবপাচার শাখায় যোগাযোগ করেন এবং বিষয়টি অবহিত করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর সিআইডির মানবপাচার শাখা দ্রুত তদন্ত ও গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার সঙ্গে অভিযুক্তদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এরই ধারাবাহিকতায় নগদ অর্থ ও অন্যান্য আলামতসহ চক্রটির ০৭ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।
মামলাটির প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, গ্রেফতারকৃতরা সংঘবদ্ধভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রত্যাশী ব্যক্তিদের টার্গেট করে ইতালির ভিসা ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করতো। চক্রটি বিভিন্ন কৌশলে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে তা নিজেদের হেফাজতে রাখতো এবং পরবর্তীতে জালিয়াতির মাধ্যমে ভিসা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানোর মতো গুরুতর অপরাধ সংগঠিত ছিল। এছাড়াও জব্দকৃত ৫৬টি পাসপোর্ট ও ১৫৩টি বিভিন্ন ধরনের সিলের উপস্থিতি থেকে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ভিসা জালিয়াতি ও মানবপাচার সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা যায় যে, গ্রেফতারকৃত চক্রের মূলহোতা ও গ্রেফতারকৃত এজাহারনামীয় ০১ নং অভিযুক্ত মো. বেলায়েত হোসেন দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের প্রক্রিয়ায় বিদেশে লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি একই কৌশলে প্রায় ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং প্রত্যেকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা হয়েছিল মর্মে তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া গ্রেফতারকৃত প্রধান অভিযুক্ত মো. বেলায়েত হোসেন একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে বিমানবন্দর (ডিএমপি) থানায় ২০২৪ সালে রুজুকৃত একটি মামলার জামিনে রয়েছে, মামলাটি বর্তমানে বিজ্ঞ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিআইডির মানবপাচার শাখা । জব্দকৃত পাসপোর্ট, সিল, কম্পিউটার ও অন্যান্য আলামতের ফরেনসিক ও কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেনের উৎস ও গন্তব্য অনুসন্ধান এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সদস্য, দেশি-বিদেশি সহযোগী ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করতে সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থ বা পাসপোর্ট হস্তান্তর না করতে দেশের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। এছাড়াও বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যথাযথভাবে যাচাই করার পাশাপাশি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি ভিসা পাইয়ে দেওয়ার নামে অস্বাভাবিক অঙ্কের অর্থ দাবি করে, পাসপোর্ট জিম্মি করে রাখে অথবা ভিসা জালিয়াতি, মানবপাচার কিংবা অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহ হয় তাহলে দ্রুত নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অথবা সিআইডিকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।