বিশেষ সংবাদ :
নিজস্ব প্রতিবেদক, এম এ হান্নান তারিখ, : ০৬ অক্টোবর, ২০২৬]
মোংলা: আধুনিক সভ্যতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী সাপের খেলা ও ভেষজ চিকিৎসার পসরা নিয়ে মোংলা পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় দেখা মিলল যাযাবর বেদে সম্প্রদায়ের। গত কাল [গত কালের বার, উদা: সোমবার] দিনভর পৌরসভার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা সাপের খেলা দেখিয়ে ও ভেষজ গাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গলায় সাপের বাক্স ঝুলিয়ে, হাতে বীণ বাজিয়ে দলবেঁধে ঘুরছেন বেদে নারীরা। তাদের পেছনে কৌতূহলী শিশুদের ভিড়। কোনো বাড়ির উঠোনে বা রাস্তার পাশে বাক্স খুলে সাপ বের করতেই জমে ওঠে আসর। বীণের সুরে সাপের ফণা তোলার দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হন দর্শক। খেলা শেষে তারা দর্শকদের ‘রাহু-কেতু’ বা ‘নজর দোষ’ থেকে মুক্তির নানা গল্প শোনান এবং বিনিময়ে এক টুকরো ‘সৌভাগ্যবর্ধক’ ভেষজ গাছ বা তাবিজ ধরিয়ে দেন।
এই গাছ বা খেলার বিনিময়ে তারা দর্শকদের কাছ থেকে চাল বা নগদ টাকা নেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রতিটি বাড়ির গৃহিণীরা ২০ থেকে ৫০ টাকা দিয়ে এই ভেষজ গাছ গ্রহণ করছেন এবং খেলা দেখে আনন্দ পাচ্ছেন।
দলনেতা রীনা বেদেনী (আনুমানিক ৩৫) জানান, তারা সাভার থেকে এসেছেন। বর্তমানে মোংলা নদীর ওপারে কূলে তাবু খাটিয়ে সাময়িকভাবে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, “সাপের খেলা দেখানো আমাদের বাপ-দাদার পেশা। কিন্তু এখন মানুষ আর আগের মতো সাপের খেলা দেখতে চায় না। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যুগে আমাদের এই বিদ্যা কেউ আর বিশ্বাস করে না। তাই পেট চালাতে এখন খেলার পাশাপাশি টুকটাক গাছ-গাছালি ও তাবিজ বিক্রি করি।”
রীনা আরও জানান, সারা দিন পৌর এলাকায় ঘুরে যা আয় হয়, তা দিয়ে চাল-ডাল কিনতেই শেষ হয়ে যায়। তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করার মতো সামর্থ্য তাদের নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় হাট-বাজারে নিয়মিত বেদেদের দেখা মিললেও এখন তা বিরল। মোংলা পৌরসভার বাসিন্দা আমেনা বেগম বলেন, “ছোটবেলায় কত খেলা দেখেছি! এখন আর দেখাই যায় না। আজ হঠাৎ বাড়ির সামনে বীণের আওয়াজ শুনে ভালো লাগল। শিশুদেরও দেখালাম। ২০ টাকা দিয়ে এক টুকরো গাছও নিলাম, ওরা তো এই করেই খায়।”
আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যম এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কড়াকড়িতে বেদেদের এই আদি পেশা এখন অস্তিত্বের সংকটে। জীবিকার সন্ধানে তারা এখন যাযাবরের মতো এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আর কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে এই লোকজ শিল্প।